এ বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা এবার কাঁচা চামড়া বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কয়েকটি সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারিভাবে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হচ্ছে, চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং লবণ লাগাতে যে শ্রম ব্যয় হয়, সেটিও মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবদিক চিন্তা করেই এবার চামড়ার যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। তিনি আরও জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কাঁচা চামড়া চীনের ও ভিয়েতনামের মতো বাজারে রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে চাহিদা ও মূল্য— উভয়ই স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়া খাতকে রক্ষায় এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এবারের কোরবানির মৌসুমে চামড়া নিয়ে অতীতের মতো নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমই) সূত্রে জানা গেছে, এবছর কোরবানির পশুর চামড়ার সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ পিস ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া। গত বছর এই সংখ্যা ছিল এক কোটিরও বেশি। চামড়ার পরিমাণে এই বৃদ্ধি ট্যানারি শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করলেও, এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রস্তুতি শুরু করেছে ট্যানারি মালিক, আড়তদার এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। চামড়া যাতে যথাসময়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে লবণ সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং মূল্য তদারকি সংক্রান্ত নানা দিক নজরে রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল। বিএইচএসএমই আশা প্রকাশ করেছে, সরকারের সদিচ্ছা ও বাজারব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এ বছর চামড়া খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে, যা শিল্পখাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। বিএইচএসএমই মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, ‘সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তিন মাসের জন্য তুলে নিয়েছে সেটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের তো সেই সক্ষমতা নেই চামড়া রপ্তানির জন্য। আমাদের আগে সক্ষম করে তুলতে হবে। কাঁচা চামড়া রপ্তানি খবরে দাম বাড়বে এটা ঠিক। এই চামড়া যারা কিনবে সেসব বড় ব্যবসায়ীরা সরকার পরিবর্তনের ফলে আত্মগোপনে আছে। তারা এবার অনেকেই চামড়া কিনবে না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশে অনেকে অর্থ বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো চামড়া কেনায় ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘কাঁচা চামড়া রপ্তানির বিষয়টি ভালোভাবে নেননি ট্যানারি মালিকরা। তারা যদি চামড়া কেনা কমিয়ে দেয় সেটি ভালো হবে না। সরকার আবার এ বছর চামড়ার দাম গড়ে ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়িয়েছে। তারপর বৃষ্টির মৌসুম টানা বৃষ্টি হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে চামড়ার বাজারে এক ধরনের শঙ্কা রয়ে গেছে। ’ এ বিষয়ে বিএইচএসএমইর সাবেক সভাপতি ও মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আফতাব খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ নিঃসন্দেহে সরকারের ভালো উদ্যোগ। এর সুফল সবাই পাবে। অনেক সময় ট্যানারি চামড়া নিতো না, সে জিম্মিদশা কাটবে। তবে কিছুটা সমস্যাও আছে, যেমন, কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে হলে একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের সেটা নেই বা সক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে নেই। কারণ আমারা আগে কখনো চামড়া রপ্তানি করিনি। আমাদের নতুন বাজার ধরা ও রপ্তানিকারক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ’ ট্যানারিশিল্পের মালিকদের গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইউএ) ভাইস চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল। তিনি বলেন, এতে করে চামড়াশিল্প নগরীতে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া উৎপাদনে ট্যানারি মালিকদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ বাড়বে এবং ফুটওয়্যার ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়বে। লেদার সেক্টরের মোট রপ্তানি আয় শতকরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হবে। ফলে ট্যানারি সেক্টরে নিয়োজিত হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা বেকার হয়ে পড়বেন। দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে সর্বশেষ বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০১৩ সালে, যখন কোরবানির গরুর প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। কিন্তু এরপর থেকে নানা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণে চামড়ার মূল্য ধারাবাহিকভাবে কমে আসে। এক দশকের বেশি সময় পর চলতি বছর সরকার চামড়ার মূল্য সামান্য হলেও বাড়িয়েছে, যা বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও পুরোনো রেকর্ড থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবছর ঢাকায় কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৩৫০ টাকা; যা মফস্বলে নির্ধারিত হয়েছে ১,১৫০ টাকা। প্রতি বর্গফুট হিসাবে ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। অর্থাৎ, চলতি বছর প্রতি বর্গফুটে গরুর চামড়ার দাম গড়ে ৫ টাকা করে বেড়েছে। এছাড়া, খাসির লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার মূল্য ২২ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা করে বেশি। মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা সামান্য হলেও বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে, যদি সঠিকভাবে তদারকি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫ সালের পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি গরু ও মহিষ, ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি ছাগল ও ভেড়া, এবং ৫ হাজার ৫১২টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী কোরবানির উপযোগী। চাহিদার তুলনায় এবারও গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে ২০ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি, যা অভ্যন্তরীণ সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের চামড়া শিল্পের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চামড়ার চাহিদা বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় বাড়ার এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কোরবানির সময় সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে ঈদুল আজহার সময় সংগৃহীত চামড়া থেকেই দেশের চামড়া শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৫
এ বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা এবার কাঁচা চামড়া বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কয়েকটি সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারিভাবে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হচ্ছে, চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং লবণ লাগাতে যে শ্রম ব্যয় হয়, সেটিও মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবদিক চিন্তা করেই এবার চামড়ার যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। তিনি আরও জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কাঁচা চামড়া চীনের ও ভিয়েতনামের মতো বাজারে রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে চাহিদা ও মূল্য— উভয়ই স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়া খাতকে রক্ষায় এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এবারের কোরবানির মৌসুমে চামড়া নিয়ে অতীতের মতো নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমই) সূত্রে জানা গেছে, এবছর কোরবানির পশুর চামড়ার সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ পিস ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া। গত বছর এই সংখ্যা ছিল এক কোটিরও বেশি। চামড়ার পরিমাণে এই বৃদ্ধি ট্যানারি শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করলেও, এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রস্তুতি শুরু করেছে ট্যানারি মালিক, আড়তদার এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। চামড়া যাতে যথাসময়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে লবণ সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং মূল্য তদারকি সংক্রান্ত নানা দিক নজরে রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল। বিএইচএসএমই আশা প্রকাশ করেছে, সরকারের সদিচ্ছা ও বাজারব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এ বছর চামড়া খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে, যা শিল্পখাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। বিএইচএসএমই মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, ‘সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তিন মাসের জন্য তুলে নিয়েছে সেটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের তো সেই সক্ষমতা নেই চামড়া রপ্তানির জন্য। আমাদের আগে সক্ষম করে তুলতে হবে। কাঁচা চামড়া রপ্তানি খবরে দাম বাড়বে এটা ঠিক। এই চামড়া যারা কিনবে সেসব বড় ব্যবসায়ীরা সরকার পরিবর্তনের ফলে আত্মগোপনে আছে। তারা এবার অনেকেই চামড়া কিনবে না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশে অনেকে অর্থ বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো চামড়া কেনায় ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘কাঁচা চামড়া রপ্তানির বিষয়টি ভালোভাবে নেননি ট্যানারি মালিকরা। তারা যদি চামড়া কেনা কমিয়ে দেয় সেটি ভালো হবে না। সরকার আবার এ বছর চামড়ার দাম গড়ে ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়িয়েছে। তারপর বৃষ্টির মৌসুম টানা বৃষ্টি হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে চামড়ার বাজারে এক ধরনের শঙ্কা রয়ে গেছে। ’ এ বিষয়ে বিএইচএসএমইর সাবেক সভাপতি ও মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আফতাব খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ নিঃসন্দেহে সরকারের ভালো উদ্যোগ। এর সুফল সবাই পাবে। অনেক সময় ট্যানারি চামড়া নিতো না, সে জিম্মিদশা কাটবে। তবে কিছুটা সমস্যাও আছে, যেমন, কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে হলে একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের সেটা নেই বা সক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে নেই। কারণ আমারা আগে কখনো চামড়া রপ্তানি করিনি। আমাদের নতুন বাজার ধরা ও রপ্তানিকারক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ’ ট্যানারিশিল্পের মালিকদের গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইউএ) ভাইস চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল। তিনি বলেন, এতে করে চামড়াশিল্প নগরীতে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া উৎপাদনে ট্যানারি মালিকদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ বাড়বে এবং ফুটওয়্যার ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়বে। লেদার সেক্টরের মোট রপ্তানি আয় শতকরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হবে। ফলে ট্যানারি সেক্টরে নিয়োজিত হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা বেকার হয়ে পড়বেন। দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে সর্বশেষ বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০১৩ সালে, যখন কোরবানির গরুর প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। কিন্তু এরপর থেকে নানা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণে চামড়ার মূল্য ধারাবাহিকভাবে কমে আসে। এক দশকের বেশি সময় পর চলতি বছর সরকার চামড়ার মূল্য সামান্য হলেও বাড়িয়েছে, যা বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও পুরোনো রেকর্ড থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবছর ঢাকায় কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৩৫০ টাকা; যা মফস্বলে নির্ধারিত হয়েছে ১,১৫০ টাকা। প্রতি বর্গফুট হিসাবে ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। অর্থাৎ, চলতি বছর প্রতি বর্গফুটে গরুর চামড়ার দাম গড়ে ৫ টাকা করে বেড়েছে। এছাড়া, খাসির লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার মূল্য ২২ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা করে বেশি। মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা সামান্য হলেও বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে, যদি সঠিকভাবে তদারকি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫ সালের পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি গরু ও মহিষ, ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি ছাগল ও ভেড়া, এবং ৫ হাজার ৫১২টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী কোরবানির উপযোগী। চাহিদার তুলনায় এবারও গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে ২০ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি, যা অভ্যন্তরীণ সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের চামড়া শিল্পের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চামড়ার চাহিদা বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় বাড়ার এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কোরবানির সময় সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে ঈদুল আজহার সময় সংগৃহীত চামড়া থেকেই দেশের চামড়া শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন