নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

সংবাদকর্মীর জীবন কষ্ট, ঝুঁকি আর দায়িত্বের বোঝা

সংবাদকর্মীর জীবন কষ্ট, ঝুঁকি আর দায়িত্বের বোঝা

সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশের জন্য প্রতিদিন অদৃশ্য সংগ্রাম করেন—ঝুঁকি, মানসিক চাপ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও। তাদের ত্যাগ সমাজের চোখ ও কণ্ঠ হিসেবে গণতন্ত্র ও জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করে। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সম্মান নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র ও সাংবাদিক—দুই শক্তিই প্রতিটি আন্দোলনে পথপ্রদর্শক। স্বাধীনতার লড়াই থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের ভূমিকা অনন্য। তাদের কলম, ক্যামেরা ও কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল জনমতের প্রতিফলন।

কখনো সাহসী প্রতিবেদন শাসকের অন্যায় উন্মোচন করেছে, কখনো মানুষের কষ্টের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেশীয় সাংবাদিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করেছেন। এভাবেই সাংবাদিকতা এদেশে গণতান্ত্রিক চেতনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংবাদিকের পেশা দেখতে অনেকটা মর্যাদাপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ, তথ্য যাচাই, নির্ভুল লেখা—এসবের ফাঁকে নিজের জন্য সময় প্রায় থাকে না।
পরিবারের অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত সুখ–দুঃখ, এমনকি স্বাস্থ্যের খেয়ালও অনেক সময় তারা উপেক্ষা করেন।

একজন সাংবাদিককে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়—দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা—যখনই ঘটে, তখনই মাঠে নামতে হয়। পাঠক বা দর্শক শুধু চূড়ান্ত খবরটি পান, কিন্তু তার পেছনের ঘাম–ঝরানো শ্রম আর মানসিক চাপ অদৃশ্যই থেকে যায়।

বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক এখনো ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরতরা চাকরির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন। মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থাকা, চুক্তিভিত্তিক কাজ কিংবা বিনা বেতনে সংবাদ পরিবেশনের বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এমনকি বড় বড় জাতীয় গণমাধ্যমেও বেতন বৈষম্য প্রকট। অথচ এই পেশার ঝুঁকি ও দায়িত্ব অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে কম নয়।

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের অন্যতম বড় বাধা হলো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ। সংবাদ প্রকাশে হুমকি, মামলা, এমনকি শারীরিক আক্রমণও অস্বাভাবিক নয়।
কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা ব্যবসায়িক স্বার্থের চাপেও সংবাদ পরিবেশনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে সাংবাদিকরা দ্বন্দ্বে পড়েন—সত্য প্রকাশ করবেন নাকি চাকরি ও জীবিকার নিরাপত্তা রক্ষা করবেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা বা আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে বহু সাংবাদিক জীবন হারিয়েছেন কিংবা গুরুতর আহত হয়েছেন।
২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা তারই প্রমাণ।
এত বিপদ জেনেও তারা কাজ চালিয়ে যান, কারণ সংবাদমাধ্যম ছাড়া সত্য প্রকাশের অন্য কোনো কার্যকর মাধ্যম নেই।

সাংবাদিকদের এই অদৃশ্য সংগ্রাম ব্যক্তিগত নয়—এটি আসলে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়।
কারণ, তারা গণতন্ত্র রক্ষার প্রহরী। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নষ্ট হয়।
তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ আরও বহুমুখী। ভুয়া খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তি এবং দ্রুত তথ্যপ্রবাহের কারণে যাচাই–বাছাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তি যেমন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অনেক কাজ সহজ করছে, কিন্তু মানবিক বিশ্লেষণ ও নৈতিকতার জায়গায় সাংবাদিকের ভূমিকা অদ্বিতীয়।

সাংবাদিকরা সমাজের চোখ–কান। তারা অদৃশ্য ত্যাগের মধ্য দিয়ে মানুষের জানার অধিকার রক্ষা করেন।
তাদের রক্ত–ঘামে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়। তাই রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান—সবারই দায়িত্ব সাংবাদিকদের ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
কারণ, সত্য প্রকাশের লড়াই থেমে গেলে সমাজও অন্ধকারে ঢেকে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


সংবাদকর্মীর জীবন কষ্ট, ঝুঁকি আর দায়িত্বের বোঝা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

featured Image

সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশের জন্য প্রতিদিন অদৃশ্য সংগ্রাম করেন—ঝুঁকি, মানসিক চাপ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও। তাদের ত্যাগ সমাজের চোখ ও কণ্ঠ হিসেবে গণতন্ত্র ও জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করে। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সম্মান নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র ও সাংবাদিক—দুই শক্তিই প্রতিটি আন্দোলনে পথপ্রদর্শক। স্বাধীনতার লড়াই থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের ভূমিকা অনন্য। তাদের কলম, ক্যামেরা ও কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল জনমতের প্রতিফলন।

কখনো সাহসী প্রতিবেদন শাসকের অন্যায় উন্মোচন করেছে, কখনো মানুষের কষ্টের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেশীয় সাংবাদিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করেছেন। এভাবেই সাংবাদিকতা এদেশে গণতান্ত্রিক চেতনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংবাদিকের পেশা দেখতে অনেকটা মর্যাদাপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ, তথ্য যাচাই, নির্ভুল লেখা—এসবের ফাঁকে নিজের জন্য সময় প্রায় থাকে না।
পরিবারের অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত সুখ–দুঃখ, এমনকি স্বাস্থ্যের খেয়ালও অনেক সময় তারা উপেক্ষা করেন।

একজন সাংবাদিককে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়—দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা—যখনই ঘটে, তখনই মাঠে নামতে হয়। পাঠক বা দর্শক শুধু চূড়ান্ত খবরটি পান, কিন্তু তার পেছনের ঘাম–ঝরানো শ্রম আর মানসিক চাপ অদৃশ্যই থেকে যায়।

বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক এখনো ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরতরা চাকরির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন। মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থাকা, চুক্তিভিত্তিক কাজ কিংবা বিনা বেতনে সংবাদ পরিবেশনের বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এমনকি বড় বড় জাতীয় গণমাধ্যমেও বেতন বৈষম্য প্রকট। অথচ এই পেশার ঝুঁকি ও দায়িত্ব অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে কম নয়।

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের অন্যতম বড় বাধা হলো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ। সংবাদ প্রকাশে হুমকি, মামলা, এমনকি শারীরিক আক্রমণও অস্বাভাবিক নয়।
কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা ব্যবসায়িক স্বার্থের চাপেও সংবাদ পরিবেশনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে সাংবাদিকরা দ্বন্দ্বে পড়েন—সত্য প্রকাশ করবেন নাকি চাকরি ও জীবিকার নিরাপত্তা রক্ষা করবেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা বা আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে বহু সাংবাদিক জীবন হারিয়েছেন কিংবা গুরুতর আহত হয়েছেন।
২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা তারই প্রমাণ।
এত বিপদ জেনেও তারা কাজ চালিয়ে যান, কারণ সংবাদমাধ্যম ছাড়া সত্য প্রকাশের অন্য কোনো কার্যকর মাধ্যম নেই।

সাংবাদিকদের এই অদৃশ্য সংগ্রাম ব্যক্তিগত নয়—এটি আসলে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়।
কারণ, তারা গণতন্ত্র রক্ষার প্রহরী। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নষ্ট হয়।
তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ আরও বহুমুখী। ভুয়া খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তি এবং দ্রুত তথ্যপ্রবাহের কারণে যাচাই–বাছাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তি যেমন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অনেক কাজ সহজ করছে, কিন্তু মানবিক বিশ্লেষণ ও নৈতিকতার জায়গায় সাংবাদিকের ভূমিকা অদ্বিতীয়।

সাংবাদিকরা সমাজের চোখ–কান। তারা অদৃশ্য ত্যাগের মধ্য দিয়ে মানুষের জানার অধিকার রক্ষা করেন।
তাদের রক্ত–ঘামে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়। তাই রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান—সবারই দায়িত্ব সাংবাদিকদের ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
কারণ, সত্য প্রকাশের লড়াই থেমে গেলে সমাজও অন্ধকারে ঢেকে যাবে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত