কলাম: জাহিদ ইকবাল
কিন্তু সাধারণ পাঠকের মনে তখন একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—এই দুর্বৃত্ত কারা? কেন সাংবাদিকরা আসল অপরাধীর নাম প্রকাশ করেন না এবং সব দায় যেন রহস্যময় ‘দুর্বৃত্তদের’ ওপরই চাপিয়ে দেন?
বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
প্রথমত, আইনি ঝুঁকি একটি বড় বিষয়। বাংলাদেশে মানহানি আইনসহ বিভিন্ন আইনি বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া অভিযোগ প্রকাশ করলে সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। মানহানির মামলা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকেও প্রভাবিত করে। ফলে অনেক সময় “দুর্বৃত্ত” শব্দটি সাংবাদিকদের কাছে এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবও একটি বড় বাস্তবতা। অনেক সহিংস ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও সরাসরি তাদের নাম প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। হুমকি, চাপ, এমনকি শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও সাংবাদিকদের জীবনে নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে স্থানীয় সাংবাদিকরা এ ধরনের ঝুঁকির মুখে বেশি থাকেন। তাই অনেক সময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়।
তৃতীয়ত, পুলিশ বা প্রশাসনের ভাষা সংবাদে বড় প্রভাব ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা পুলিশের ব্রিফিং বা থানার তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সংবাদ তৈরি করেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ প্রায়ই বলে—“অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্ত” বা “অজ্ঞাত ব্যক্তি”। সেই ভাষাই অনেক সময় সংবাদে হুবহু চলে আসে। ফলে “দুর্বৃত্ত” শব্দটি ধীরে ধীরে সংবাদভাষার একটি প্রচলিত অংশ হয়ে উঠেছে।
চতুর্থত, তথ্যের সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক হামলা ঘটে রাতের অন্ধকারে, অথবা খুব দ্রুততার সঙ্গে। হামলাকারীরা মুখ ঢেকে রাখে বা দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরাও অনেক সময় নিশ্চিতভাবে কাউকে শনাক্ত করতে পারেন না। এই অবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। অনলাইন পোর্টালগুলোতে অনেক সময় ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংবাদ প্রকাশ করতে হয়। দ্রুততার এই চাপের কারণে সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে নিশ্চিত তথ্য না থাকলে “দুর্বৃত্ত” শব্দ ব্যবহার করেই সংবাদ প্রকাশ করা হয় এবং পরবর্তীতে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপডেট করা হয়।
তবে “দুর্বৃত্ত” শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেকের মতে, এটি অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও কখনও এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। পাঠক তখন পুরো সত্যটি জানতে পারেন না।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু ঘটনা জানানো নয়; সত্য অনুসন্ধান করা এবং দায় নির্ধারণে সমাজকে সহায়তা করা। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব এখানে অনেক বেশি। ঘটনার পরবর্তী সময়ে তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা তুলে ধরা প্রয়োজন।
বাস্তবতা হলো, সংবাদে “দুর্বৃত্ত” শব্দের ব্যবহার সাংবাদিকদের ভয়, আইনি সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে এটি আমাদের গণমাধ্যমের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকেও তুলে ধরে।
একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যখন আরও বিকশিত হবে, তখন হয়তো সংবাদে এই রহস্যময় “দুর্বৃত্ত” শব্দের ব্যবহার কমে আসবে। তখন অপরাধীরা পরিচয়সহ চিহ্নিত হবে, দায় নির্ধারণ হবে এবং নাগরিকরা সত্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে।
সেদিন সংবাদ শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম থাকবে না; বরং তা হবে সামাজিক ন্যায়, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শক্তিশালী দিকনির্দেশক।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মার্চ ২০২৬
কলাম: জাহিদ ইকবাল
কিন্তু সাধারণ পাঠকের মনে তখন একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—এই দুর্বৃত্ত কারা? কেন সাংবাদিকরা আসল অপরাধীর নাম প্রকাশ করেন না এবং সব দায় যেন রহস্যময় ‘দুর্বৃত্তদের’ ওপরই চাপিয়ে দেন?
বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
প্রথমত, আইনি ঝুঁকি একটি বড় বিষয়। বাংলাদেশে মানহানি আইনসহ বিভিন্ন আইনি বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া অভিযোগ প্রকাশ করলে সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। মানহানির মামলা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকেও প্রভাবিত করে। ফলে অনেক সময় “দুর্বৃত্ত” শব্দটি সাংবাদিকদের কাছে এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবও একটি বড় বাস্তবতা। অনেক সহিংস ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও সরাসরি তাদের নাম প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। হুমকি, চাপ, এমনকি শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও সাংবাদিকদের জীবনে নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে স্থানীয় সাংবাদিকরা এ ধরনের ঝুঁকির মুখে বেশি থাকেন। তাই অনেক সময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়।
তৃতীয়ত, পুলিশ বা প্রশাসনের ভাষা সংবাদে বড় প্রভাব ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা পুলিশের ব্রিফিং বা থানার তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সংবাদ তৈরি করেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ প্রায়ই বলে—“অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্ত” বা “অজ্ঞাত ব্যক্তি”। সেই ভাষাই অনেক সময় সংবাদে হুবহু চলে আসে। ফলে “দুর্বৃত্ত” শব্দটি ধীরে ধীরে সংবাদভাষার একটি প্রচলিত অংশ হয়ে উঠেছে।
চতুর্থত, তথ্যের সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক হামলা ঘটে রাতের অন্ধকারে, অথবা খুব দ্রুততার সঙ্গে। হামলাকারীরা মুখ ঢেকে রাখে বা দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরাও অনেক সময় নিশ্চিতভাবে কাউকে শনাক্ত করতে পারেন না। এই অবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। অনলাইন পোর্টালগুলোতে অনেক সময় ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংবাদ প্রকাশ করতে হয়। দ্রুততার এই চাপের কারণে সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে নিশ্চিত তথ্য না থাকলে “দুর্বৃত্ত” শব্দ ব্যবহার করেই সংবাদ প্রকাশ করা হয় এবং পরবর্তীতে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপডেট করা হয়।
তবে “দুর্বৃত্ত” শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেকের মতে, এটি অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও কখনও এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। পাঠক তখন পুরো সত্যটি জানতে পারেন না।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু ঘটনা জানানো নয়; সত্য অনুসন্ধান করা এবং দায় নির্ধারণে সমাজকে সহায়তা করা। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব এখানে অনেক বেশি। ঘটনার পরবর্তী সময়ে তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা তুলে ধরা প্রয়োজন।
বাস্তবতা হলো, সংবাদে “দুর্বৃত্ত” শব্দের ব্যবহার সাংবাদিকদের ভয়, আইনি সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে এটি আমাদের গণমাধ্যমের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকেও তুলে ধরে।
একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যখন আরও বিকশিত হবে, তখন হয়তো সংবাদে এই রহস্যময় “দুর্বৃত্ত” শব্দের ব্যবহার কমে আসবে। তখন অপরাধীরা পরিচয়সহ চিহ্নিত হবে, দায় নির্ধারণ হবে এবং নাগরিকরা সত্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে।
সেদিন সংবাদ শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম থাকবে না; বরং তা হবে সামাজিক ন্যায়, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শক্তিশালী দিকনির্দেশক।

আপনার মতামত লিখুন