সময় কম কিন্তু প্রভাব অনেক
প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
২ মিনিটের ট্রেন যাত্রাবিরতি, মুকসুদপুরে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা
গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের দুই মিনিটের যাত্রাবিরতি চালু হওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত হলেও এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি রেলস্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি চালু হওয়া মানে সেখানে একটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি হওয়া। মুকসুদপুর স্টেশনেও তার ব্যতিক্রম হবে না। যাত্রী ওঠানামা শুরু হলে স্টেশনকেন্দ্রিক চা-স্টল, রেস্টুরেন্ট, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। এতে স্বল্প পুঁজি নিয়ে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গতিশীলতা তৈরি করবে।
অন্যদিকে, এই যাত্রাবিরতি স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। এতদিন আন্তঃনগর ট্রেন ধরতে যাত্রীদের গোপালগঞ্জ সদর, ফরিদপুর বা পার্শ্ববর্তী জেলায় যেতে হতো। এতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে হতো। এখন মুকসুদপুর থেকেই সরাসরি ট্রেনে ওঠার সুযোগ তৈরি হওয়ায় যাত্রীদের সময় ও অর্থ—উভয়েরই সাশ্রয় হবে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি ব্যক্তিগত সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং ভোগব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়াবে।
সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে শ্রমবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। মুকসুদপুরের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সহজে যাতায়াত করতে পারবে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করবে। অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক বা সাপ্তাহিক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ এলাকার মানুষের শহরমুখী স্থায়ী অভিবাসনের চাপও কিছুটা কমতে পারে। এর ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে।
কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলের জন্য ট্রেন যাত্রাবিরতি একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহনের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষিপণ্য ঢাকাসহ বড় বাজারে পাঠানো সহজ হবে। বিশেষ করে শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন পণ্যের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিবহন সময় কমে গেলে পণ্যের গুণগত মান বজায় থাকবে এবং কৃষকরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবে।
এছাড়া, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সাধারণত রিয়েল এস্টেট খাতকে সক্রিয় করে তোলে। মুকসুদপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে জমির চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নতুন আবাসন প্রকল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুদাম বা স্টোরেজ সুবিধা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি আধা-নগরায়িত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে। যোগাযোগ সুবিধা বাড়লে নতুন ব্যবসা শুরু করা, পণ্য সরবরাহ করা এবং বাজার সম্প্রসারণ করা সহজ হয়। ফলে পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা ও খুচরা ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুগুণক প্রভাব সৃষ্টি করবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। স্টেশন এলাকায় যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়াতে না পারলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। এছাড়া আরও আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা গেলে এর প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
এই অর্জনের পেছনে মূল কৃতিত্ব স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের। মুকসুদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিষয়টি রেলমন্ত্রীর নজরে আনেন।
সেলিমুজ্জামান এর কার্যকর পদক্ষেপের ফলেই রেল মন্ত্রণালয় ঢাকা–বেনাপোল রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ‘রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের মুকসুদপুরে ২ মিনিটের যাত্রাবিরতির অনুমোদন দেয়। স্থানীয় জনগণের প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দৃঢ়তা মুকসুদপুরের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। যদিও সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম এখানেই থেমে থাকতে চান না, তিনি ইতিমধ্যে খুলনা–ঢাকা রুটে চলাচলকারী ‘জাহানাবাদ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রাবিরতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানোনোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বর্তমানে মাত্র দুই মিনিটের যাত্রাবিরতি থাকায় বড় আকারে পণ্য ওঠানামা বা লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনা কিছুটা সীমিত থাকবে। তবে এটি ভবিষ্যতে আরও উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, মুকসুদপুরে আন্তঃনগর ট্রেনের এই যাত্রাবিরতি শুধু একটি পরিবহন সুবিধা নয়; এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতে বৃহৎ আঞ্চলিক উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।
সভাপতি, মুকসুদপুর প্রেসক্লাব।
উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত
আপনার মতামত লিখুন