নজর বিডি

নিকুঞ্জে ড্যান্ডিখোর আতঙ্ক: মাদকের ফাঁদে তলিয়ে যাচ্ছে পথশিশুরা

নিকুঞ্জে ড্যান্ডিখোর আতঙ্ক: মাদকের ফাঁদে তলিয়ে যাচ্ছে পথশিশুরা

জাহিদ ইকবাল | নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার অভিজাত নিকুঞ্জ-২ এলাকায় প্রতিদিনই চোখে পড়ছে এক করুণ দৃশ্য—ফুটপাতে বসে পথশিশুদের ‘ড্যান্ডি’ নামে এক ধরনের গাম শোঁকার দৃশ্য। সহজলভ্য এই গামের নেশায় আসক্ত হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও পুনর্বাসনের অভাবে এই মাদক এখন নতুন সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

ফুটপাতে শিশুর নেশা—এক নির্মম বাস্তবতা

নিকুঞ্জ-২ এলাকার এক পাশে পাঁচতারকা হোটেল ‘মেরিডিয়ান’, আরেক পাশে ফুটপাতে বসে আছে সাত-আট বছরের এক শিশু। হাতে পলিথিন, মুখে গাম। দূর থেকে মনে হচ্ছিল কিছু খাচ্ছে, কাছে গিয়ে বোঝা গেল—সে আসলে নেশায় মগ্ন।
শিশুটির নাম রাব্বি। বাড়ি নিকুঞ্জ ঘেঁষা টানপাড়ার জামতলায়। প্রশ্ন করা হলে বলে,

“মোর বাপ-মা নাই, এল্লিগাইতো ড্যান্ডি খাই।”

এই ছোট্ট উত্তরই যেন সমাজের নিষ্ঠুরতার এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে ক্ষুধা, একাকিত্ব ও বঞ্চনা মিলেমিশে যাচ্ছে মাদকের গন্ধে।

ড্যান্ডি গাম: সস্তা নেশার নতুন রূপ

‘ড্যান্ডি’ এক ধরনের শিল্পগাম, যা সাধারণত জুতা তৈরিতে বা গ্যারেজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন এটি পথশিশুদের সস্তা নেশার উপকরণে পরিণত হয়েছে। মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় এটি সহজেই পাওয়া যায় শহরের হার্ডওয়্যার বা যানবাহন যন্ত্রাংশের দোকানে।
শিশুরা পলিথিনে গাম ঢেলে মুখে ধরে জোরে শ্বাস নেয়—এরপর কয়েক মুহূর্তেই তারা ঢলে পড়ে নেশার ঘোরে।

নিকুঞ্জ-২ এলাকার মেরিডিয়ান হোটেলের আশপাশ, ফুটওভার ব্রিজের নিচে ও রেললাইন ঘেঁষা খাঁপাড়া এলাকায় প্রতিনিয়ত এই দৃশ্য দেখা যায়।

“ড্যান্ডিখোর গ্যাং” নামে আতঙ্ক

স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন এলাকায় একদল কিশোর ‘ড্যান্ডিখোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। তারা দিনরাত প্রকাশ্যে গাম শোঁকে, পথচারীদের বিরক্ত করে এবং মাঝে মাঝে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটায়। নিকুঞ্জবাসীর কাছে এটি এখন এক মহা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনের নীরবতা ও আইনের ফাঁক

খিলক্ষেত থানার এক কর্মকর্তা জানান,

“অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় এসব শিশু-কিশোরকে আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করা সম্ভব নয়।”

তারা টঙ্গী শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে যোগাযোগের পরামর্শ দেন, কিন্তু কার্যকর পুনর্বাসন না থাকায় বাস্তবে কোনও পরিবর্তন আসছে না। ফলে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে ড্যান্ডি-আসক্ত শিশুর সংখ্যা।

সহজলভ্যতাই বড় বিপদ

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি হার্ডওয়্যার দোকান বা জুতার উপকরণ বিক্রেতা দোকানে ‘ড্যান্ডি গাম’ সহজলভ্য। কোনো লাইসেন্স বা বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ নেই। হাতে গোনা কয়েক টাকায় শিশুরা কিনে নিচ্ছে এই মারাত্মক নেশাদ্রব্য। সচেতন মহলের আশঙ্কা—এভাবে চলতে থাকলে ড্যান্ডি-আসক্তি রাজধানীর আরও এলাকায় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়বে।

সমাধানের প্রস্তাব

সমাজকর্মী ও স্থানীয়দের মতে, এ বিপর্যয় রোধে এখনই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
 * গাম বিক্রিতে লাইসেন্স ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ চালু করা।
 * নেশাগ্রস্ত শিশুদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থার উন্নয়ন।
 * প্রশাসন, এনজিও ও স্থানীয় কমিউনিটির যৌথ সচেতনতামূলক অভিযান।

শেষ কথা

নিকুঞ্জের ফুটপাতে ড্যান্ডি হাতে বসে থাকা শিশুরা আজ উপেক্ষিত, কিন্তু তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক।
আজ যদি তাদের দিকে সমাজ না ফিরে তাকায়, কাল তারাই হারিয়ে যাবে অপরাধ ও অন্ধকারের জগতে।
এখনই দরকার কার্যকর উদ্যোগ—কারণ এই শিশুরা সহানুভূতি নয়, চায় একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


নিকুঞ্জে ড্যান্ডিখোর আতঙ্ক: মাদকের ফাঁদে তলিয়ে যাচ্ছে পথশিশুরা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫

featured Image

জাহিদ ইকবাল | নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার অভিজাত নিকুঞ্জ-২ এলাকায় প্রতিদিনই চোখে পড়ছে এক করুণ দৃশ্য—ফুটপাতে বসে পথশিশুদের ‘ড্যান্ডি’ নামে এক ধরনের গাম শোঁকার দৃশ্য। সহজলভ্য এই গামের নেশায় আসক্ত হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও পুনর্বাসনের অভাবে এই মাদক এখন নতুন সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

ফুটপাতে শিশুর নেশা—এক নির্মম বাস্তবতা

নিকুঞ্জ-২ এলাকার এক পাশে পাঁচতারকা হোটেল ‘মেরিডিয়ান’, আরেক পাশে ফুটপাতে বসে আছে সাত-আট বছরের এক শিশু। হাতে পলিথিন, মুখে গাম। দূর থেকে মনে হচ্ছিল কিছু খাচ্ছে, কাছে গিয়ে বোঝা গেল—সে আসলে নেশায় মগ্ন।
শিশুটির নাম রাব্বি। বাড়ি নিকুঞ্জ ঘেঁষা টানপাড়ার জামতলায়। প্রশ্ন করা হলে বলে,

“মোর বাপ-মা নাই, এল্লিগাইতো ড্যান্ডি খাই।”

এই ছোট্ট উত্তরই যেন সমাজের নিষ্ঠুরতার এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে ক্ষুধা, একাকিত্ব ও বঞ্চনা মিলেমিশে যাচ্ছে মাদকের গন্ধে।

ড্যান্ডি গাম: সস্তা নেশার নতুন রূপ

‘ড্যান্ডি’ এক ধরনের শিল্পগাম, যা সাধারণত জুতা তৈরিতে বা গ্যারেজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন এটি পথশিশুদের সস্তা নেশার উপকরণে পরিণত হয়েছে। মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় এটি সহজেই পাওয়া যায় শহরের হার্ডওয়্যার বা যানবাহন যন্ত্রাংশের দোকানে।
শিশুরা পলিথিনে গাম ঢেলে মুখে ধরে জোরে শ্বাস নেয়—এরপর কয়েক মুহূর্তেই তারা ঢলে পড়ে নেশার ঘোরে।

নিকুঞ্জ-২ এলাকার মেরিডিয়ান হোটেলের আশপাশ, ফুটওভার ব্রিজের নিচে ও রেললাইন ঘেঁষা খাঁপাড়া এলাকায় প্রতিনিয়ত এই দৃশ্য দেখা যায়।

“ড্যান্ডিখোর গ্যাং” নামে আতঙ্ক

স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন এলাকায় একদল কিশোর ‘ড্যান্ডিখোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। তারা দিনরাত প্রকাশ্যে গাম শোঁকে, পথচারীদের বিরক্ত করে এবং মাঝে মাঝে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটায়। নিকুঞ্জবাসীর কাছে এটি এখন এক মহা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনের নীরবতা ও আইনের ফাঁক

খিলক্ষেত থানার এক কর্মকর্তা জানান,

“অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় এসব শিশু-কিশোরকে আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করা সম্ভব নয়।”

তারা টঙ্গী শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে যোগাযোগের পরামর্শ দেন, কিন্তু কার্যকর পুনর্বাসন না থাকায় বাস্তবে কোনও পরিবর্তন আসছে না। ফলে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে ড্যান্ডি-আসক্ত শিশুর সংখ্যা।

সহজলভ্যতাই বড় বিপদ

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি হার্ডওয়্যার দোকান বা জুতার উপকরণ বিক্রেতা দোকানে ‘ড্যান্ডি গাম’ সহজলভ্য। কোনো লাইসেন্স বা বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ নেই। হাতে গোনা কয়েক টাকায় শিশুরা কিনে নিচ্ছে এই মারাত্মক নেশাদ্রব্য। সচেতন মহলের আশঙ্কা—এভাবে চলতে থাকলে ড্যান্ডি-আসক্তি রাজধানীর আরও এলাকায় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়বে।

সমাধানের প্রস্তাব

সমাজকর্মী ও স্থানীয়দের মতে, এ বিপর্যয় রোধে এখনই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
 * গাম বিক্রিতে লাইসেন্স ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ চালু করা।
 * নেশাগ্রস্ত শিশুদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থার উন্নয়ন।
 * প্রশাসন, এনজিও ও স্থানীয় কমিউনিটির যৌথ সচেতনতামূলক অভিযান।

শেষ কথা

নিকুঞ্জের ফুটপাতে ড্যান্ডি হাতে বসে থাকা শিশুরা আজ উপেক্ষিত, কিন্তু তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক।
আজ যদি তাদের দিকে সমাজ না ফিরে তাকায়, কাল তারাই হারিয়ে যাবে অপরাধ ও অন্ধকারের জগতে।
এখনই দরকার কার্যকর উদ্যোগ—কারণ এই শিশুরা সহানুভূতি নয়, চায় একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত