নজর বিডি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

ঢাকা শহরের পরিবেশ সংকট ও নিরসনের উপায়

ঢাকা শহরের পরিবেশ সংকট ও নিরসনের উপায়

ড. মোহাম্মদ নূরুল হক
পরিবেশবিদ ও শিক্ষক

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ শুধু জনসংখ্যার ভারেই নয়, পরিবেশগত সংকটেও বিপর্যস্ত এক মহানগর। প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস এই শহরে। দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের চাপ ঢাকার পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো বায়ুদূষণ। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ বায়ুদূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে PM2.5 কণার অতিমাত্রা মানুষের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার নির্গমন—সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাস আজ বিষাক্ত।

বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের কর্মক্ষমতা কমাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে নগরের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অথচ পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে এই সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আরো পড়ুন: চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া

ঢাকার আরেকটি নীরব সংকট হলো পানিদূষণ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদী আজ কার্যত জীবিত নদী নয়, বরং বর্জ্য নিষ্কাশনের ড্রেনেজে পরিণত হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং গৃহস্থালি আবর্জনা নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার ভবিষ্যতের পানিসংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ঢাকার পরিবেশ সংকটের একটি বড় কারণ। প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্যের বড় অংশই সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয় না। ই-বর্জ্য নতুন করে যুক্ত হয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অথচ আধুনিক পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র, কমিউনিটি-ভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং জৈব বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের উদ্যোগ নিলে এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ঢাকাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতিবছর লাখো মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে শহরের জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে এবং অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব ঢাকাকে বসবাসের জন্য আরও কঠিন করে তুলছে।

বাণিজ্য মেলায় বিআরটিসি-র শাটল বাস সার্ভিস শুরু ১ জানুয়ারি: অনলাইনেও মিলবে টিকিট

এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ববোধ। ছাদে সবুজায়ন, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণে নাগরিকদের সক্রিয় হতে হবে।

ঢাকার পরিবেশ সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি ও উদাসীনতার প্রতিফলন। এখনই যদি সমন্বিত নীতি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ঢাকা অদূর ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য নগরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টেকসই নগর গড়ার প্রশ্নে আজ সিদ্ধান্ত নেওয়াই আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


ঢাকা শহরের পরিবেশ সংকট ও নিরসনের উপায়

প্রকাশের তারিখ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

ড. মোহাম্মদ নূরুল হক
পরিবেশবিদ ও শিক্ষক

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ শুধু জনসংখ্যার ভারেই নয়, পরিবেশগত সংকটেও বিপর্যস্ত এক মহানগর। প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস এই শহরে। দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের চাপ ঢাকার পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো বায়ুদূষণ। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ বায়ুদূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে PM2.5 কণার অতিমাত্রা মানুষের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার নির্গমন—সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাস আজ বিষাক্ত।

বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের কর্মক্ষমতা কমাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে নগরের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অথচ পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে এই সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আরো পড়ুন: চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া

ঢাকার আরেকটি নীরব সংকট হলো পানিদূষণ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদী আজ কার্যত জীবিত নদী নয়, বরং বর্জ্য নিষ্কাশনের ড্রেনেজে পরিণত হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং গৃহস্থালি আবর্জনা নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার ভবিষ্যতের পানিসংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ঢাকার পরিবেশ সংকটের একটি বড় কারণ। প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্যের বড় অংশই সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হয় না। ই-বর্জ্য নতুন করে যুক্ত হয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অথচ আধুনিক পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র, কমিউনিটি-ভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং জৈব বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের উদ্যোগ নিলে এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ঢাকাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতিবছর লাখো মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে শহরের জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে এবং অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব ঢাকাকে বসবাসের জন্য আরও কঠিন করে তুলছে।

বাণিজ্য মেলায় বিআরটিসি-র শাটল বাস সার্ভিস শুরু ১ জানুয়ারি: অনলাইনেও মিলবে টিকিট

এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ববোধ। ছাদে সবুজায়ন, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণে নাগরিকদের সক্রিয় হতে হবে।

ঢাকার পরিবেশ সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি ও উদাসীনতার প্রতিফলন। এখনই যদি সমন্বিত নীতি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ঢাকা অদূর ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য নগরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টেকসই নগর গড়ার প্রশ্নে আজ সিদ্ধান্ত নেওয়াই আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত