ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ২০০০ সালে জজকোর্ট চত্বরে মুরগি মিলনকে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল, প্রায় একই কায়দায় সম্প্রতি নিউ মার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ড অপরাধ জগতের পুরনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একের পর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কারামুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে পুঁজি করে ঢাকা কি আবারও ‘গ্যাং কালচারের’ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন জনমনে প্রবল।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার ডনদের শাসন চলত ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে। একদিকে সুব্রত বাইন, কালা জাহাঙ্গীর; আর অন্যদিকে জোসেফ, বিকাশ ও প্রকাশ। দীর্ঘ ১৬ বছর কঠোর নজরদারিতে এই নেটওয়ার্কগুলো অনেকটা ভেঙে পড়লেও বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, যা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে সুইডেন আসলাম: তেজগাঁও ও তৎসংলগ্ন এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক।কিলার আব্বাস: মিরপুর ও পল্লবী এলাকার আতঙ্ক। পিচ্চি হেলাল: মোহাম্মদপুর ও বেড়িবাঁধ এলাকার দাপুটে নাম। ফ্রিডম রাসু ও সানজিদুল ইসলাম ইমন: হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকার নিয়ন্ত্রক।
অপরাধ বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, "Violence begets violence" (সহিংসতা সহিংসতাকেই জন্ম দেয়)। বিশ্লেষকদের মতে, টিটনের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি ‘সিগন্যাল’। টিটনের বোন জামাই সানজিদুল ইসলাম ইমন বিদেশে থাকলেও তার নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। জোসেফ আহমেদ যেভাবে দীর্ঘ ২৭ বছর পর তার ভাই হত্যার বদলা নিয়েছেন, টিটন হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেও তার অনুসারীরা মাঠে নামবে—এমন আশঙ্কায় কাঁপছে আন্ডারওয়ার্ল্ড।
৫ আগস্টের পর পুলিশের চেইন অফ কমান্ডে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাকে অপরাধ জগতের ভাষায় বলা হয় ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতা। ডিবির নজরদারি শিথিল হওয়ায় অপরাধীরা নিজেদের পুরনো এলাকা ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য (চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি) পুনরুদ্ধারে মরিয়া। যদিও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম কঠোর নজরদারির দাবি করেছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত ভিন্ন আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন "সন্ত্রাসীরা জেল থেকে বের হয়ে হারানো অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। পুলিশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে তারা যদি শিকড় গেড়ে ফেলে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।"
মুরগি মিলন হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার রাজপথ যেভাবে লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছিল, টিটন হত্যা সেই একই ইতিহাসের সংকেত দিচ্ছে। এখনই কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর বিশেষ নজরদারি বা ‘সারভেইল্যান্স’ বাড়ানো না গেলে রাজধানী আবারও পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক ছোট-বড় গ্যাংগুলোর রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ‘ফিল্মি স্টাইল’ কিলিং মিশন বন্ধ করা এখন কেবল পুলিশের রুটিন কাজ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ২০০০ সালে জজকোর্ট চত্বরে মুরগি মিলনকে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল, প্রায় একই কায়দায় সম্প্রতি নিউ মার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ড অপরাধ জগতের পুরনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একের পর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কারামুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে পুঁজি করে ঢাকা কি আবারও ‘গ্যাং কালচারের’ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন জনমনে প্রবল।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার ডনদের শাসন চলত ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে। একদিকে সুব্রত বাইন, কালা জাহাঙ্গীর; আর অন্যদিকে জোসেফ, বিকাশ ও প্রকাশ। দীর্ঘ ১৬ বছর কঠোর নজরদারিতে এই নেটওয়ার্কগুলো অনেকটা ভেঙে পড়লেও বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, যা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে সুইডেন আসলাম: তেজগাঁও ও তৎসংলগ্ন এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক।কিলার আব্বাস: মিরপুর ও পল্লবী এলাকার আতঙ্ক। পিচ্চি হেলাল: মোহাম্মদপুর ও বেড়িবাঁধ এলাকার দাপুটে নাম। ফ্রিডম রাসু ও সানজিদুল ইসলাম ইমন: হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকার নিয়ন্ত্রক।
অপরাধ বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, "Violence begets violence" (সহিংসতা সহিংসতাকেই জন্ম দেয়)। বিশ্লেষকদের মতে, টিটনের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি ‘সিগন্যাল’। টিটনের বোন জামাই সানজিদুল ইসলাম ইমন বিদেশে থাকলেও তার নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। জোসেফ আহমেদ যেভাবে দীর্ঘ ২৭ বছর পর তার ভাই হত্যার বদলা নিয়েছেন, টিটন হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেও তার অনুসারীরা মাঠে নামবে—এমন আশঙ্কায় কাঁপছে আন্ডারওয়ার্ল্ড।
৫ আগস্টের পর পুলিশের চেইন অফ কমান্ডে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাকে অপরাধ জগতের ভাষায় বলা হয় ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতা। ডিবির নজরদারি শিথিল হওয়ায় অপরাধীরা নিজেদের পুরনো এলাকা ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য (চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি) পুনরুদ্ধারে মরিয়া। যদিও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম কঠোর নজরদারির দাবি করেছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত ভিন্ন আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন "সন্ত্রাসীরা জেল থেকে বের হয়ে হারানো অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। পুলিশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে তারা যদি শিকড় গেড়ে ফেলে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।"
মুরগি মিলন হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার রাজপথ যেভাবে লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছিল, টিটন হত্যা সেই একই ইতিহাসের সংকেত দিচ্ছে। এখনই কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর বিশেষ নজরদারি বা ‘সারভেইল্যান্স’ বাড়ানো না গেলে রাজধানী আবারও পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক ছোট-বড় গ্যাংগুলোর রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ‘ফিল্মি স্টাইল’ কিলিং মিশন বন্ধ করা এখন কেবল পুলিশের রুটিন কাজ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন