নজর বিডি
প্রকাশ : বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬

গাজীপুরে সংঘর্ষ-গুলির দুই দিন

গাজীপুরে সংঘর্ষ-গুলির দুই দিন

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল সময় ৪ ও ৫ আগস্ট—এই দুই দিন গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সফিপুরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং আতঙ্কে থমকে যায় জনজীবন। আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং পাল্টা রাবার বুলেট নিক্ষেপে শতাধিক মানুষ আহত হন। দুই দিনের সহিংসতায় প্রাণ হারান অন্তত তিনজন আন্দোলনকারী।

৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে ধীরে ধীরে সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা চন্দ্রা উড়ালসড়কের নিচে থাকা দুটি পুলিশ বক্সে আগুন দেয়। পরে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মুহূর্তেই পুরো এলাকা ধোঁয়া ও আগুনে ছেয়ে যায়।

স্থানীয় চায়ের দোকানি আলী হোসেন ও তার সহযোগী কালাম বেপারি জানান, আগুন লাগানোর সময় তারা দোকান রক্ষার জন্য অনুরোধ করেন। পরে দোকানের একটি টেলিভিশন ও কিছু মালামাল সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেও আশপাশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অগ্নিসংযোগের কিছুক্ষণ পর বিক্ষুব্ধ জনতা তিন দিক থেকে কালিয়াকৈর থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। দুপুরের দিকে থানার গেট ভাঙার চেষ্টা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হলে তৎকালীন ওসি এফ এম নাছিমের নেতৃত্বে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। সে সময় স্থানীয় হাসপাতালগুলো কার্যত অচল থাকায় আহতদের অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়েন।

লতিফপুর এলাকার স্কুলশিক্ষিকা লাভলি আক্তার বলেন, গুলির শব্দে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। আহত আন্দোলনকারীরা আশ্রয়ের জন্য তাদের বাড়িতে এলে তিনি ঘরে থাকা তুলা ও স্যাভলন দিয়ে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।

সেদিনের দায়িত্বে থাকা কালিয়াকৈর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কায় আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নিতে হয়। সন্ধ্যার পর জীবন বাঁচাতে অনেক পুলিশ সদস্য পোশাক পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে এলাকা ত্যাগ করেন।

পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকামুখী জনস্রোতে লাখো মানুষ গাজীপুর অতিক্রম করেন। দুপুরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিভিন্ন স্থাপনা, ভাস্কর্য ও নামফলকে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

বিকেলে সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আনসার সদস্যদের সংঘর্ষ বাধে। প্রধান ফটকে ভাঙচুর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আনসার সদস্যরা পাল্টা ব্যবস্থা নেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

একই দিনে চন্দ্রা এলাকায় বন বিভাগের রেঞ্জ ও বিট অফিসেও ভাঙচুর চালানো হয়। সেখান থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটলেও পরে যৌথবাহিনী সেগুলোর বেশিরভাগ উদ্ধার করে।

৫ আগস্টের সংঘর্ষে কালিয়াকৈরে তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন। তারা হলেন—আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইলিম শিকদার ও জসিম ফকির। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো হত্যা মামলা করা হয়নি।

এ ঘটনায় কালিয়াকৈর থানায় পৃথক চারটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। অনেক আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এ পর্যন্ত চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আন্দোলনের সামনের সারির অংশগ্রহণকারী দেওয়ান মাহবুব আলম পনির ও সমন্বয়ক রেদুয়ান রহমান আদনান বলেন, সংঘর্ষে আহত অনেকের শরীরে এখনো গুলির চিহ্ন বহন করতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত আহত ও নিহতদের অনেকেই এখনো যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা পাননি, অথচ প্রকৃত অংশগ্রহণকারী নন—এমন ব্যক্তিরাও সরকারি তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

বিষয় : গাজীপুরে সংঘর্ষ-গুলির দুই দিন

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গাজীপুরে সংঘর্ষ-গুলির দুই দিন

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল সময় ৪ ও ৫ আগস্ট—এই দুই দিন গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সফিপুরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং আতঙ্কে থমকে যায় জনজীবন। আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং পাল্টা রাবার বুলেট নিক্ষেপে শতাধিক মানুষ আহত হন। দুই দিনের সহিংসতায় প্রাণ হারান অন্তত তিনজন আন্দোলনকারী।

৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে ধীরে ধীরে সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা চন্দ্রা উড়ালসড়কের নিচে থাকা দুটি পুলিশ বক্সে আগুন দেয়। পরে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মুহূর্তেই পুরো এলাকা ধোঁয়া ও আগুনে ছেয়ে যায়।

স্থানীয় চায়ের দোকানি আলী হোসেন ও তার সহযোগী কালাম বেপারি জানান, আগুন লাগানোর সময় তারা দোকান রক্ষার জন্য অনুরোধ করেন। পরে দোকানের একটি টেলিভিশন ও কিছু মালামাল সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেও আশপাশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অগ্নিসংযোগের কিছুক্ষণ পর বিক্ষুব্ধ জনতা তিন দিক থেকে কালিয়াকৈর থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। দুপুরের দিকে থানার গেট ভাঙার চেষ্টা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হলে তৎকালীন ওসি এফ এম নাছিমের নেতৃত্বে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। সে সময় স্থানীয় হাসপাতালগুলো কার্যত অচল থাকায় আহতদের অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়েন।

লতিফপুর এলাকার স্কুলশিক্ষিকা লাভলি আক্তার বলেন, গুলির শব্দে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। আহত আন্দোলনকারীরা আশ্রয়ের জন্য তাদের বাড়িতে এলে তিনি ঘরে থাকা তুলা ও স্যাভলন দিয়ে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।

সেদিনের দায়িত্বে থাকা কালিয়াকৈর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কায় আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নিতে হয়। সন্ধ্যার পর জীবন বাঁচাতে অনেক পুলিশ সদস্য পোশাক পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে এলাকা ত্যাগ করেন।

পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকামুখী জনস্রোতে লাখো মানুষ গাজীপুর অতিক্রম করেন। দুপুরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিভিন্ন স্থাপনা, ভাস্কর্য ও নামফলকে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

বিকেলে সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আনসার সদস্যদের সংঘর্ষ বাধে। প্রধান ফটকে ভাঙচুর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আনসার সদস্যরা পাল্টা ব্যবস্থা নেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

একই দিনে চন্দ্রা এলাকায় বন বিভাগের রেঞ্জ ও বিট অফিসেও ভাঙচুর চালানো হয়। সেখান থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটলেও পরে যৌথবাহিনী সেগুলোর বেশিরভাগ উদ্ধার করে।

৫ আগস্টের সংঘর্ষে কালিয়াকৈরে তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন। তারা হলেন—আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইলিম শিকদার ও জসিম ফকির। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো হত্যা মামলা করা হয়নি।

এ ঘটনায় কালিয়াকৈর থানায় পৃথক চারটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। অনেক আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এ পর্যন্ত চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আন্দোলনের সামনের সারির অংশগ্রহণকারী দেওয়ান মাহবুব আলম পনির ও সমন্বয়ক রেদুয়ান রহমান আদনান বলেন, সংঘর্ষে আহত অনেকের শরীরে এখনো গুলির চিহ্ন বহন করতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত আহত ও নিহতদের অনেকেই এখনো যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা পাননি, অথচ প্রকৃত অংশগ্রহণকারী নন—এমন ব্যক্তিরাও সরকারি তালিকায় স্থান পেয়েছেন।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত