নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একমাত্র সমাধান নিজ দেশে ফেরা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একমাত্র সমাধান নিজ দেশে ফেরা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ (২৮)। পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আট দিন হাঁটার পর উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেন তিনি। নয় বছর পরও সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাকে কাঁদায়। তবে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট তার।

আরিফুল্লাহ বলেন, “মিলিটারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে আট দিন হাঁটার পর এ দেশে এসেছিলাম। সেই কথা মনে পড়লে এখনো কান্না পায়। কিন্তু সেটি আমার দেশ, আমার ভূমি। সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই।”

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের কারণে আরও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে আশ্রিতদের মতামতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)। ২০২৫ সালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে সংগঠনটির প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ইউসিআরে ইমাম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী প্রতিনিধি, মাঝি, প্রবীণ নাগরিক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, যুবকসহ ১৪ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সংগঠনটি বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সমন্বয় ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের প্রতি রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ। তবে তারা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চান না। নিজেদের দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়াই তাদের একমাত্র সমাধান।

রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ফুরকান মির্জা বলেন, ইউসিআর প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। সংগঠনটি তাদের ঐক্য, জবাবদিহিতা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্থানীয়রা দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। তবে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপের কারণে স্থানীয়দের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে ধাপে ধাপে ফেরত পাঠানো দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানোই প্রত্যাবাসন নয়, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইনের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে আরাকান আর্মি। একই সঙ্গে জান্তা বাহিনীও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইনে চলমান সংঘাত বন্ধ হতে হবে। এরপর তাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব শর্ত তৈরি হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সংকট সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

এদিকে ২৫ আগস্ট নবমবারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হবে। এ উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবি আবারও সামনে এসেছে।

বিষয় : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একমাত্র সমাধান নিজ দেশে ফেরা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একমাত্র সমাধান নিজ দেশে ফেরা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ (২৮)। পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আট দিন হাঁটার পর উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেন তিনি। নয় বছর পরও সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাকে কাঁদায়। তবে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট তার।

আরিফুল্লাহ বলেন, “মিলিটারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে আট দিন হাঁটার পর এ দেশে এসেছিলাম। সেই কথা মনে পড়লে এখনো কান্না পায়। কিন্তু সেটি আমার দেশ, আমার ভূমি। সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই।”

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের কারণে আরও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে আশ্রিতদের মতামতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)। ২০২৫ সালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে সংগঠনটির প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ইউসিআরে ইমাম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী প্রতিনিধি, মাঝি, প্রবীণ নাগরিক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, যুবকসহ ১৪ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সংগঠনটি বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সমন্বয় ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের প্রতি রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ। তবে তারা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চান না। নিজেদের দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়াই তাদের একমাত্র সমাধান।

রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ফুরকান মির্জা বলেন, ইউসিআর প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। সংগঠনটি তাদের ঐক্য, জবাবদিহিতা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্থানীয়রা দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। তবে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপের কারণে স্থানীয়দের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে ধাপে ধাপে ফেরত পাঠানো দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানোই প্রত্যাবাসন নয়, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাত প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইনের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে আরাকান আর্মি। একই সঙ্গে জান্তা বাহিনীও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইনে চলমান সংঘাত বন্ধ হতে হবে। এরপর তাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব শর্ত তৈরি হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সংকট সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

এদিকে ২৫ আগস্ট নবমবারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হবে। এ উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবি আবারও সামনে এসেছে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত