কৃষিনির্ভর খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, ফসলি জমির আইলে, পুকুরপাড়ে কিংবা পতিত জমিতে এখন সারি সারি দেশি খেজুর গাছের দেখা মেলে। এসব গাছে থোকায় থোকায় কাঁচা-পাকা খেজুর ধরলেও মূলত মানুষের আগ্রহের অভাবে অধিকাংশ ফল নষ্ট হচ্ছে। সময়ের পরিবর্তনে এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ও মুখরোচক এই ফলটি এখন ডুমুরিয়ায় মূলত পাখির প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় এক দশক আগেও বাজারে দেশি খেজুরের আলাদা কদর ও বাণিজ্যিক চাহিদা ছিল। গ্রামীণ মানুষ গাছ থেকে খেজুর পেড়ে কলসিতে লবণ-পানিতে ভিজিয়ে কয়েক দিন রেখে পাকিয়ে খেতেন। তবে বাজারে বিদেশি খেজুরের সহজলভ্যতা এবং প্রচারের অভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেশি খেজুরের আকর্ষণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
টিপনা গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুল জব্বার গাজী ও স্থানীয় বাসিন্দা খানজাহান আলী আক্ষেপ করে বলেন, "ছোটবেলায় গাছ থেকে পেড়ে অনেক খেজুর খেয়েছি। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে সেই আগ্রহ আর দেখা যায় না। আমরা আমাদের পুষ্টিকর দেশি ফল খাওয়া ভুলে যাচ্ছি, যার ফলে আমরা শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছি।"
একই সুর শোনা গেল মতলেব মোল্লা, সামাদ গাজী ও শহিদুল ইসলামের কণ্ঠেও। তাঁরা জানান, বাজারে এখন হাতের নাগালেই বিভিন্ন বিদেশি খেজুর পাওয়া যায়, যা আকারে বড় এবং আঁটির তুলনায় শাঁস বেশি। ফলে আঁটি বড় ও শাঁস কম হওয়ায় দেশি খেজুরের দিক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
শীতকালে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করা গাছি অরুণ ধাবক বলেন, "আমি প্রায় ৩০০ গাছ থেকে শীতের মৌসুমে রস সংগ্রহ করি। এখন প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় খেজুর ঝুলছে। তবে একটা খেজুরও পাড়ি না, সব ফল পাখির জন্য রেখে দিয়েছি। প্রতিদিন শালিক, বুলবুলিসহ শত শত পাখি আসে ফল খেতে। ওদের কিচিরমিচির শুনতে বেশ ভালো লাগে।"
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও চিকিৎসকদের মতে, দেশি খেজুরসহ সব মৌসুমি ফলই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব ফলে কোনো কৃত্রিম কীটনাশক বা কেমিক্যাল থাকে না বিধায় এগুলো এক একটি প্রাকৃতিক ভিটামিনের ভাণ্ডার।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা এই বিষয়ে বলেন, "দেশি খেজুর আমাদের ঐতিহ্যের একটা বড় অংশ। বিদেশি খেজুরের চেয়ে এর পুষ্টিগুণ কোনো অংশে কম নয়; বরং এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বাণিজ্যিক প্রচারের অভাব এবং বিদেশি ফলের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ আগ্রহ হারাচ্ছে। আমরা কৃষকদের এই দেশি ফলদ বৃক্ষ সংরক্ষণের পরামর্শ দিচ্ছি।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম দেশি ফলের ঐতিহ্য ও পুষ্টিগুণ রক্ষার তাগিদ দিয়ে বলেন, "দেশি খেজুরের মতো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু চাষাবাদ বাড়ালেই হবে না, এর সুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমাদের অধিদপ্তর স্থানীয় জাতের ফলদ বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের জন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে।"

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
কৃষিনির্ভর খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, ফসলি জমির আইলে, পুকুরপাড়ে কিংবা পতিত জমিতে এখন সারি সারি দেশি খেজুর গাছের দেখা মেলে। এসব গাছে থোকায় থোকায় কাঁচা-পাকা খেজুর ধরলেও মূলত মানুষের আগ্রহের অভাবে অধিকাংশ ফল নষ্ট হচ্ছে। সময়ের পরিবর্তনে এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ও মুখরোচক এই ফলটি এখন ডুমুরিয়ায় মূলত পাখির প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় এক দশক আগেও বাজারে দেশি খেজুরের আলাদা কদর ও বাণিজ্যিক চাহিদা ছিল। গ্রামীণ মানুষ গাছ থেকে খেজুর পেড়ে কলসিতে লবণ-পানিতে ভিজিয়ে কয়েক দিন রেখে পাকিয়ে খেতেন। তবে বাজারে বিদেশি খেজুরের সহজলভ্যতা এবং প্রচারের অভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেশি খেজুরের আকর্ষণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
টিপনা গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুল জব্বার গাজী ও স্থানীয় বাসিন্দা খানজাহান আলী আক্ষেপ করে বলেন, "ছোটবেলায় গাছ থেকে পেড়ে অনেক খেজুর খেয়েছি। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে সেই আগ্রহ আর দেখা যায় না। আমরা আমাদের পুষ্টিকর দেশি ফল খাওয়া ভুলে যাচ্ছি, যার ফলে আমরা শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছি।"
একই সুর শোনা গেল মতলেব মোল্লা, সামাদ গাজী ও শহিদুল ইসলামের কণ্ঠেও। তাঁরা জানান, বাজারে এখন হাতের নাগালেই বিভিন্ন বিদেশি খেজুর পাওয়া যায়, যা আকারে বড় এবং আঁটির তুলনায় শাঁস বেশি। ফলে আঁটি বড় ও শাঁস কম হওয়ায় দেশি খেজুরের দিক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
শীতকালে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করা গাছি অরুণ ধাবক বলেন, "আমি প্রায় ৩০০ গাছ থেকে শীতের মৌসুমে রস সংগ্রহ করি। এখন প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় খেজুর ঝুলছে। তবে একটা খেজুরও পাড়ি না, সব ফল পাখির জন্য রেখে দিয়েছি। প্রতিদিন শালিক, বুলবুলিসহ শত শত পাখি আসে ফল খেতে। ওদের কিচিরমিচির শুনতে বেশ ভালো লাগে।"
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও চিকিৎসকদের মতে, দেশি খেজুরসহ সব মৌসুমি ফলই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব ফলে কোনো কৃত্রিম কীটনাশক বা কেমিক্যাল থাকে না বিধায় এগুলো এক একটি প্রাকৃতিক ভিটামিনের ভাণ্ডার।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা এই বিষয়ে বলেন, "দেশি খেজুর আমাদের ঐতিহ্যের একটা বড় অংশ। বিদেশি খেজুরের চেয়ে এর পুষ্টিগুণ কোনো অংশে কম নয়; বরং এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বাণিজ্যিক প্রচারের অভাব এবং বিদেশি ফলের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ আগ্রহ হারাচ্ছে। আমরা কৃষকদের এই দেশি ফলদ বৃক্ষ সংরক্ষণের পরামর্শ দিচ্ছি।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম দেশি ফলের ঐতিহ্য ও পুষ্টিগুণ রক্ষার তাগিদ দিয়ে বলেন, "দেশি খেজুরের মতো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু চাষাবাদ বাড়ালেই হবে না, এর সুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমাদের অধিদপ্তর স্থানীয় জাতের ফলদ বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের জন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে।"

আপনার মতামত লিখুন