বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর পদে দায়িত্ব পালনকালে যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের বিপরীতে সাময়িক আইনি সুরক্ষা লাভ করেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্কের মুখে প্রশ্ন উঠেছে—এই আইনি সুবিধা কি কোনো ব্যক্তির জন্য অপরাধের চিরস্থায়ী সনদ, নাকি তা কেবল পদের মর্যাদা রক্ষার সাময়িক প্রশাসনিক অধিকার (Procedural Immunity)?
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া)-এর উপাচার্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আসিফ মিজান এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, পদে আসীন থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কোনো কার্যধারা গ্রহণ বা তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে আন্তর্জাতিক আইনি দর্শন ও তুলনামূলক শাসনতন্ত্রের (Comparative Constitutional Law) আলোকে এটি চিরস্থায়ী অনাক্রম্যতা নয়।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য সুরক্ষা পেতে পারেন, কিন্তু পদে থাকা অবস্থায় বা দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে সংঘটিত জঘন্য ব্যক্তিগত অপরাধ বা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে সংবিধানের এ সুরক্ষা চিরস্থায়ী ঢাল হতে পারে না।
৫১(১) অনুচ্ছেদ কেবল পদে থাকা সময়ের জন্য প্রযোজ্য। পদ ত্যাগের পর উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচারিক মুখোমুখি হতে কোনো আইনি বাধা থাকে না।
রাষ্ট্রপতি পদে বসার আগের কোনো অপরাধের বিচার পদ সামলানোর সময় স্থগিত থাকলেও, মেয়াদ শেষে বা পদত্যাগের পর তাঁর বিচার হওয়া আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বাধ্যতামূলক।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রপ্রধানদের এই সাময়িক সুরক্ষা কখনোই অপরাধের অনাক্রম্যতা (Absolute Immunity) হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি:
যুক্তরাষ্ট্র: Nixon v. Fitzgerald (1982) ও সাম্প্রতিক Trump v. United States (2024) মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত অপরাধ পৃথক।
ফ্রান্স: পদে থাকা অবস্থায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট সুরক্ষা পেলেও, পদ ছাড়ার ঠিক এক মাস পর থেকেই তদন্ত চালু হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ও জ্যাক শিরাকের বিচার এর অন্যতম উদাহরণ।
দক্ষিণ কোরিয়া ও পেরু: দুর্নীতির অভিযোগে বহু সাবেক প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর শাস্তি পেয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংকটকালীন মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা কৌশলগত হতে পারে, তবে তা অতীত অপরাধের ‘আইনি মাফ’ হতে পারে না।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদের অপব্যবহার রোধে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং একটি স্পষ্ট আইনি নীতিমালা প্রয়োজন। সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির অতীত অপরাধ ও বিতর্কিত ভূমিকার নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাকে নতুন বাংলাদেশের মূল গণদাবি ও আইনের শাসনের ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর পদে দায়িত্ব পালনকালে যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের বিপরীতে সাময়িক আইনি সুরক্ষা লাভ করেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্কের মুখে প্রশ্ন উঠেছে—এই আইনি সুবিধা কি কোনো ব্যক্তির জন্য অপরাধের চিরস্থায়ী সনদ, নাকি তা কেবল পদের মর্যাদা রক্ষার সাময়িক প্রশাসনিক অধিকার (Procedural Immunity)?
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া)-এর উপাচার্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আসিফ মিজান এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, পদে আসীন থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কোনো কার্যধারা গ্রহণ বা তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে আন্তর্জাতিক আইনি দর্শন ও তুলনামূলক শাসনতন্ত্রের (Comparative Constitutional Law) আলোকে এটি চিরস্থায়ী অনাক্রম্যতা নয়।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য সুরক্ষা পেতে পারেন, কিন্তু পদে থাকা অবস্থায় বা দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে সংঘটিত জঘন্য ব্যক্তিগত অপরাধ বা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে সংবিধানের এ সুরক্ষা চিরস্থায়ী ঢাল হতে পারে না।
৫১(১) অনুচ্ছেদ কেবল পদে থাকা সময়ের জন্য প্রযোজ্য। পদ ত্যাগের পর উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচারিক মুখোমুখি হতে কোনো আইনি বাধা থাকে না।
রাষ্ট্রপতি পদে বসার আগের কোনো অপরাধের বিচার পদ সামলানোর সময় স্থগিত থাকলেও, মেয়াদ শেষে বা পদত্যাগের পর তাঁর বিচার হওয়া আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বাধ্যতামূলক।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রপ্রধানদের এই সাময়িক সুরক্ষা কখনোই অপরাধের অনাক্রম্যতা (Absolute Immunity) হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি:
যুক্তরাষ্ট্র: Nixon v. Fitzgerald (1982) ও সাম্প্রতিক Trump v. United States (2024) মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত অপরাধ পৃথক।
ফ্রান্স: পদে থাকা অবস্থায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট সুরক্ষা পেলেও, পদ ছাড়ার ঠিক এক মাস পর থেকেই তদন্ত চালু হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ও জ্যাক শিরাকের বিচার এর অন্যতম উদাহরণ।
দক্ষিণ কোরিয়া ও পেরু: দুর্নীতির অভিযোগে বহু সাবেক প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর শাস্তি পেয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংকটকালীন মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা কৌশলগত হতে পারে, তবে তা অতীত অপরাধের ‘আইনি মাফ’ হতে পারে না।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদের অপব্যবহার রোধে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং একটি স্পষ্ট আইনি নীতিমালা প্রয়োজন। সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির অতীত অপরাধ ও বিতর্কিত ভূমিকার নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাকে নতুন বাংলাদেশের মূল গণদাবি ও আইনের শাসনের ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন