গত শুক্রবার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে মিয়ানমারসহ আটটি দেশ। এতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৭.৭ বলে নিশ্চিত করেছে ভূকম্পবিদরা।
ভূমিকম্প পরিমাপে রিখটার স্কেলের ভূমিকা
যখন কোনো এলাকায় ভূমিকম্প হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে—এর মাত্রা কত ছিল? ভূমিকম্পের শক্তি ও তীব্রতা বোঝাতে রিখটার স্কেল ব্যবহার করা হয়। এটি জানায়, ভূমিকম্পটি কতটা শক্তিশালী এবং কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
রিখটার স্কেলের উদ্ভাবন নিয়ে মানুষের মাঝে কৌতূহল রয়েছে। ১৯৩৫ সালে মার্কিন ভূকম্পবিদ চার্লস রিখটার ও তাঁর জার্মান-আমেরিকান সহকর্মী বেনো গুটেনবার্গ ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপের জন্য একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। প্রায় ৯০ বছর আগে তৈরি এই স্কেল এখনও ভূমিকম্প পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চার্লস রিখটার ও তাঁর গবেষণা
চার্লস রিখটার ছিলেন একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, যাঁর প্রধান আগ্রহ ছিল ভূমিকম্পের উৎপত্তি ও শক্তি নির্ধারণ করা। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে যত দূরে যাওয়া হয়, তত কম্পনের তীব্রতা কমে আসে।
১৯৩২ সালে তিনি এই বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং পরে ১৯৩৫ সালে গুটেনবার্গের সঙ্গে মিলে একটি লগারিদমিক স্কেল তৈরি করেন। তাঁদের এই আবিষ্কার ভূকম্পবিদ্যায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
রিখটার স্কেলের কার্যপ্রণালী
রিখটার স্কেল ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপের একটি পদ্ধতি, যা সিসমোগ্রাফ নামক যন্ত্রের মাধ্যমে ভূকম্পনের ‘অ্যামপ্লিটিউড’ বা বিস্তার রেকর্ড করে।
এই স্কেলে—
- প্রতিটি পূর্ণ সংখ্যার বৃদ্ধিতে ভূমিকম্পের কম্পনমাত্রা ১০ গুণ বেড়ে যায়।
- ধ্বংসাত্মক শক্তি ৩১.৬ গুণ বেশি হয়।
অর্থাৎ, যদি কোনো ভূমিকম্পের মাত্রা ৫.০ হয় এবং আরেকটি ভূমিকম্পের মাত্রা ৬.০ হয়, তাহলে দ্বিতীয় ভূমিকম্প প্রথমটির তুলনায় ১০ গুণ বেশি কম্পন সৃষ্টি করবে এবং শক্তি হবে প্রায় ৩১.৬ গুণ বেশি।
রিখটার স্কেলের সীমাবদ্ধতা ও আধুনিক উন্নয়ন
প্রাথমিকভাবে রিখটার স্কেল কেবল দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ভূমিকম্প পরিমাপের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটি কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় সারা বিশ্বেই এই স্কেলকে ভূমিকম্প পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে ভূকম্পবিদরা রিখটার স্কেলের কিছু সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য
মোমেন্ট ম্যাগনিচিউড স্কেল (Mw) তৈরি করেন, যা বিশেষত বৃহৎ ভূমিকম্প পরিমাপে আরও নির্ভুল ফলাফল দেয়।
রিখটার স্কেলের আগে ভূমিকম্প পরিমাপ পদ্ধতি
রিখটার স্কেল আবিষ্কারের আগে ভূমিকম্প পরিমাপের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ছিল, তবে সেগুলো তেমন নির্ভুল ছিল না। যেমন—
- মার্কেলি ইনটেনসিটি স্কেল (১৯০২): ভূমিকম্পের প্রভাব ও ক্ষতির মাত্রা দেখে পরিমাপ করা হতো।
- রসি-ফরেল স্কেল (১৮৭৩): ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করে ভূমিকম্পকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হতো।
- চীনের ঐতিহাসিক পদ্ধতি: বিভিন্ন নথির মাধ্যমে ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ধারণ করা হতো।
এসব পদ্ধতিতে ভূমিকম্পের শক্তি কতটা ছিল, তা নির্ভুলভাবে জানা যেত না।
আপনার মতামত লিখুন