নজর বিডি

রাজধানীতে খুনের হিড়িক: ছয় মাসেই প্রাণ হারালেন ২১৭ জন

রাজধানীতে খুনের হিড়িক: ছয় মাসেই প্রাণ হারালেন ২১৭ জন

ঢাকা, ২৮ জুলাই:

রাজধানী ঢাকা যেন অপরাধের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ঘটছে হত্যাকাণ্ড। চাঁদাবাজি,  ছিনতা্ই পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার বা মোবাইল ছিনতাই—এসব অজুহাতেই ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তরতাজা প্রাণ।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনায়, পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জে গতকাল (২৭ জুলাই) ভোরে আরিফুল ইসলাম বাবু নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে রবিন, শাহীন, মাসুদ, কাদেরসহ পাঁচ-ছয়জন। নিহত আরিফুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগের কয়েকটি নজরকাড়া হত্যাকাণ্ড:

  • ২৬ জুলাই, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে হার্ডওয়্যার কর্মচারী ফজলে রাব্বি সুমন ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। তার বোন জানিয়েছেন, মুন্না নামে এক বখাটে সুমনের মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ছুরিকাঘাত করে।

  • ২৩ জুলাই, ডেমরার শাপলা চত্বর সংলগ্ন নির্মাণাধীন ভবনে মোবাইল চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তরুণ মো. সোয়াদুল ইসলাম সোয়াদ

  • ১৬ জুলাই, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হন আল-আমিনইব্রাহিম। চাঁদ উদ্যান এলাকায় আল-আমিনকে কুপিয়ে এবং নবোদয় হাউজিংয়ে ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এইসব ঘটনা শুধু ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ২১৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মাসভিত্তিক চিত্র এমন:

  • জানুয়ারি: ৩৬ জন

  • ফেব্রুয়ারি: ৩৮ জন

  • মার্চ: ৩৩ জন

  • এপ্রিল: ২৯ জন

  • মে: ৩২ জন

  • জুন: ৪৯ জন

অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে একটিরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটছে ঢাকায়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব হত্যার পেছনে চাঁদাবাজি, পারিবারিক বিরোধ, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা এলাকা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় কাজ করছে।

অপরাধীরা ধরা পড়লেও সমস্যা থেকে যাচ্ছে

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন,

“ঘটনা ঘটার পরপরই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং মামলার প্রক্রিয়া শুরু করে। আমরা অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছি।”

তবে তিনি স্বীকার করেন,

“অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”

পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া & পাবলিক রিলেশনস) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান (পিপিএম) জানান, আমরা কাজ করছি, আমাদের টিম গুলো আছে । সব গুলোই প্রসপেকটাস । আগের তুলনায় ক্রাইম রেট আরো কমে আসছে। সামনে আরো কমবে।

হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ছয় মাসে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১২১ টি, তবে হত্যা মামলা হয়েছে ২১৭ টি। গত বছরের আগেও হত্যার ঘটনা একই রকম ছিল বলে জানান ।

‘নীতি না থাকলে বিচার ভেস্তে যায়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন,

“যে কারণেই খুন হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত বিচারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরা ভয় পাবে, সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরবে।”

প্রিয়জন হারানো মানুষের কান্নায় ভারী শহর

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ ও একটি স্বপ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামছে না। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার গতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই মৃত্যুর স্রোতকে রুখে দিতে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


রাজধানীতে খুনের হিড়িক: ছয় মাসেই প্রাণ হারালেন ২১৭ জন

প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৫

featured Image

ঢাকা, ২৮ জুলাই:

রাজধানী ঢাকা যেন অপরাধের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ঘটছে হত্যাকাণ্ড। চাঁদাবাজি,  ছিনতা্ই পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার বা মোবাইল ছিনতাই—এসব অজুহাতেই ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তরতাজা প্রাণ।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনায়, পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জে গতকাল (২৭ জুলাই) ভোরে আরিফুল ইসলাম বাবু নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে রবিন, শাহীন, মাসুদ, কাদেরসহ পাঁচ-ছয়জন। নিহত আরিফুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগের কয়েকটি নজরকাড়া হত্যাকাণ্ড:

  • ২৬ জুলাই, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে হার্ডওয়্যার কর্মচারী ফজলে রাব্বি সুমন ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। তার বোন জানিয়েছেন, মুন্না নামে এক বখাটে সুমনের মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ছুরিকাঘাত করে।

  • ২৩ জুলাই, ডেমরার শাপলা চত্বর সংলগ্ন নির্মাণাধীন ভবনে মোবাইল চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তরুণ মো. সোয়াদুল ইসলাম সোয়াদ

  • ১৬ জুলাই, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হন আল-আমিনইব্রাহিম। চাঁদ উদ্যান এলাকায় আল-আমিনকে কুপিয়ে এবং নবোদয় হাউজিংয়ে ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এইসব ঘটনা শুধু ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ২১৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মাসভিত্তিক চিত্র এমন:

  • জানুয়ারি: ৩৬ জন

  • ফেব্রুয়ারি: ৩৮ জন

  • মার্চ: ৩৩ জন

  • এপ্রিল: ২৯ জন

  • মে: ৩২ জন

  • জুন: ৪৯ জন

অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে একটিরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটছে ঢাকায়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব হত্যার পেছনে চাঁদাবাজি, পারিবারিক বিরোধ, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা এলাকা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় কাজ করছে।

অপরাধীরা ধরা পড়লেও সমস্যা থেকে যাচ্ছে

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন,

“ঘটনা ঘটার পরপরই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং মামলার প্রক্রিয়া শুরু করে। আমরা অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছি।”

তবে তিনি স্বীকার করেন,

“অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”

পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া & পাবলিক রিলেশনস) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান (পিপিএম) জানান, আমরা কাজ করছি, আমাদের টিম গুলো আছে । সব গুলোই প্রসপেকটাস । আগের তুলনায় ক্রাইম রেট আরো কমে আসছে। সামনে আরো কমবে।

হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ছয় মাসে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১২১ টি, তবে হত্যা মামলা হয়েছে ২১৭ টি। গত বছরের আগেও হত্যার ঘটনা একই রকম ছিল বলে জানান ।

‘নীতি না থাকলে বিচার ভেস্তে যায়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন,

“যে কারণেই খুন হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত বিচারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরা ভয় পাবে, সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরবে।”

প্রিয়জন হারানো মানুষের কান্নায় ভারী শহর

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ ও একটি স্বপ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামছে না। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার গতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই মৃত্যুর স্রোতকে রুখে দিতে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত