গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হত্যার ঘটনা যেন মনে করিয়ে দিল আগের সেই সোহাগ হত্যাকাণ্ডের কথা। তার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল এক নতুন ধরনের ভয়ংকর প্রবণতা। বিচার না হওয়া, মামলা প্রক্রিয়ায় জটিলতা, পুলিশি তদন্তে অবহেলা কিংবা প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ—এসব মিলে বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে অপরাধীরা আরও সাহসী হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ আরও আতঙ্কগ্রস্ত।
অপরাধের নতুন শিকড়
আজকের সমাজে অপরাধ আর শুধু অপরাধীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—অপরাধ নিজেই নতুন অপরাধ তৈরি করছে। একজন মানুষ যখন অপরাধের শিকার হয়ে প্রতিকার না পায়, তখন ক্ষোভ, হতাশা কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা তাকে ঠেলে দিতে পারে অপরাধের পথেই। ফলে এক ধরনের চক্রবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে—এক অপরাধের শিকার আরেক অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
অপরাধবিজ্ঞান বলছে, বিচার না হওয়া মানেই অপরাধের স্বীকৃতি দেওয়া। এ দেশে যখন কেউ খুন করে আদালত পর্যন্ত গিয়েও বেরিয়ে আসে, তখন তার আশপাশের সমাজে একটা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—“চাইলেই পার পাওয়া যায়!” এই পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবতা ও দ্বৈত ভূমিকা
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন অপরাধ দমন বা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের উদাসীনতা আরও বেশি করে নজরে আসছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ কমে এসেছে। অথচ মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা নতুন কৌশল নিয়ে অপরাধ করছে—কখনো সংঘবদ্ধভাবে, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে।
ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, মামলা নিতে গড়িমসি করা হচ্ছে, তদন্তে বিলম্ব হচ্ছে—ফলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে। মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আগেই হার মানছে। আর অপরাধীরা হয়ে উঠছে আরও নির্ভার।
অনেক সময় পুলিশের উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, অথচ পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এ ধরনের আচরণ শুধুই কর্তব্যজ্ঞানহীনতা নয়, বরং তা অপরাধীকে উৎসাহ দেওয়ার নামান্তর।
বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ন্যায়নীতির অবক্ষয়
জবাবদিহির অভাব ও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দেশের আইন, আদালত, প্রশাসন—সবই যখন জটিলতার বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন সেখানে ন্যায়ের আশা করা কঠিন।
বিচারব্যবস্থা যত দুর্বল হবে, অপরাধীরা তত আত্মবিশ্বাসী হবে। কারণ তারা জানে, অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, যে সমাজে বিচার নিশ্চিত হয়, সেখানে অপরাধ করার আগে মানুষ দশবার ভাবে।
শিক্ষার ব্যর্থতা ও সামাজিক অবক্ষয়
আমাদের সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু সেই শিক্ষার মান ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। কেবল সনদ দিয়ে মানুষ শিক্ষিত হয় না। আদর্শবান, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়তে হলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে।
একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় পাস করায় না, বরং ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ব-নৈতিকতা শেখায়। আজকের দিনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও মানুষের মূল্যবোধ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলেই দেখা যাচ্ছে—“শিক্ষিত অপরাধী” নামক ভয়াবহ এক শ্রেণির উদ্ভব।
প্রতিকার কোথায়?
এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে একযোগে কাজ করতে হবে চারটি স্তরে:

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৫
গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হত্যার ঘটনা যেন মনে করিয়ে দিল আগের সেই সোহাগ হত্যাকাণ্ডের কথা। তার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল এক নতুন ধরনের ভয়ংকর প্রবণতা। বিচার না হওয়া, মামলা প্রক্রিয়ায় জটিলতা, পুলিশি তদন্তে অবহেলা কিংবা প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ—এসব মিলে বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে অপরাধীরা আরও সাহসী হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ আরও আতঙ্কগ্রস্ত।
অপরাধের নতুন শিকড়
আজকের সমাজে অপরাধ আর শুধু অপরাধীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—অপরাধ নিজেই নতুন অপরাধ তৈরি করছে। একজন মানুষ যখন অপরাধের শিকার হয়ে প্রতিকার না পায়, তখন ক্ষোভ, হতাশা কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা তাকে ঠেলে দিতে পারে অপরাধের পথেই। ফলে এক ধরনের চক্রবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে—এক অপরাধের শিকার আরেক অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
অপরাধবিজ্ঞান বলছে, বিচার না হওয়া মানেই অপরাধের স্বীকৃতি দেওয়া। এ দেশে যখন কেউ খুন করে আদালত পর্যন্ত গিয়েও বেরিয়ে আসে, তখন তার আশপাশের সমাজে একটা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—“চাইলেই পার পাওয়া যায়!” এই পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবতা ও দ্বৈত ভূমিকা
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন অপরাধ দমন বা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের উদাসীনতা আরও বেশি করে নজরে আসছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ কমে এসেছে। অথচ মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা নতুন কৌশল নিয়ে অপরাধ করছে—কখনো সংঘবদ্ধভাবে, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে।
ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, মামলা নিতে গড়িমসি করা হচ্ছে, তদন্তে বিলম্ব হচ্ছে—ফলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে। মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আগেই হার মানছে। আর অপরাধীরা হয়ে উঠছে আরও নির্ভার।
অনেক সময় পুলিশের উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, অথচ পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এ ধরনের আচরণ শুধুই কর্তব্যজ্ঞানহীনতা নয়, বরং তা অপরাধীকে উৎসাহ দেওয়ার নামান্তর।
বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ন্যায়নীতির অবক্ষয়
জবাবদিহির অভাব ও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দেশের আইন, আদালত, প্রশাসন—সবই যখন জটিলতার বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন সেখানে ন্যায়ের আশা করা কঠিন।
বিচারব্যবস্থা যত দুর্বল হবে, অপরাধীরা তত আত্মবিশ্বাসী হবে। কারণ তারা জানে, অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, যে সমাজে বিচার নিশ্চিত হয়, সেখানে অপরাধ করার আগে মানুষ দশবার ভাবে।
শিক্ষার ব্যর্থতা ও সামাজিক অবক্ষয়
আমাদের সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু সেই শিক্ষার মান ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। কেবল সনদ দিয়ে মানুষ শিক্ষিত হয় না। আদর্শবান, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়তে হলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে।
একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় পাস করায় না, বরং ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ব-নৈতিকতা শেখায়। আজকের দিনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও মানুষের মূল্যবোধ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলেই দেখা যাচ্ছে—“শিক্ষিত অপরাধী” নামক ভয়াবহ এক শ্রেণির উদ্ভব।
প্রতিকার কোথায়?
এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে একযোগে কাজ করতে হবে চারটি স্তরে:

আপনার মতামত লিখুন