অপরাধ দমনে সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৫
✍️ মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম-সম্পাদক ও প্রকাশক: নজরবিডি
অপরাধ দমন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়, বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকেরও যৌথ দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অপরাধ সংঘটিত হলেও অনেক সময় প্রতিবেশী বা প্রত্যক্ষদর্শীরা নীরব থাকেন, যা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। তাই কার্যকর সামাজিক নজরদারি, পারিবারিক শিক্ষার উন্নয়ন, যুব সমাজকে মাদক ও গ্যাং কালচার থেকে দূরে রাখা এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা সময়ের দাবি। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে দিলে নতুন নতুন অপরাধ জন্ম নেয়। কারণ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে অনেক সময় নানা হুমকি বা প্রাণনাশের শঙ্কায় পড়তে হয়। ফলে মানুষ পিছিয়ে যায়, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক দিকনির্দেশনা ও সামাজিক সহযোগিতা থাকলে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
সামাজিক অবক্ষয় এমন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে যে অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতেও মানুষ ভয় পাচ্ছে। অপরাধ চক্র ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সুযোগ বুঝে কিছু দুষ্কৃতিকারী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই অপরাধীদের ব্যবহার করছে। এর বিনিময়ে অপরাধীরা পাচ্ছে আশ্রয় ও অর্থের যোগান, যা তাদের টিকে থাকার চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। অর্থ ও আশ্রয়—এই দুই উপাদানই অপরাধীদের সক্রিয়তার মূল ভিত্তি। কোনো অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পেছনে অর্থ একটি প্রধান উপাদান, আর অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন পড়ে। এই দুটি সুযোগ যারা দিচ্ছে, তারা থাকছে পর্দার আড়ালে। অপরাধ সবার চোখের সামনে ঘটলেও আশ্রয়দাতারা যথারীতি নিরাপদে থেকে যাচ্ছে। যদি এই আশ্রয় ও অর্থদাতাদের বিচারের আওতায় আনা যেতো, তবে অপরাধ এবং অপরাধী দুটোই কমে আসত। তাই শুধু অপরাধীদের নয়, আশ্রয়দাতা ও অর্থের যোগানদাতাদেরও অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি।
যুগ এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পৌঁছালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। সেকেলে গাড়ি, আদিম মানসিকতা ও নানা জটিলতা এখনো বিদ্যমান। অভিযোগ জানাতে এসে সাধারণ মানুষ উল্টো হয়রানির শিকার হন, ফলে ভুক্তভোগী সাহস করে প্রতিকার খুঁজতে যান না। অপরদিকে প্রশাসনের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অনেক বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, যা অপরাধীদের জন্য সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। এতে করে অপরাধীরা অর্থনৈতিকভাবে যেমন শক্তিশালী হয়, তেমনি আইনি সুরক্ষাও পেয়ে যায়। ফলে আইন যেখানে ভুক্তভোগীর আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো অপরাধীরা আইনের আশ্রয়ে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। অপরাধ দমনে সবাইকে মানসিকভাবে দৃঢ় হতে হবে। শক্তি সঞ্চার করে সেটাকে প্রয়োগ করতে পারলেই সঠিক সমাধান মিলবে।
অপরাধ দমনে গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম অপরাধের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছে নিয়মিত। তবে এরও দু’টি দিক রয়েছে। একদিকে অপরাধ প্রকাশিত হলে অপরাধীরা সংকোচে পড়ে, অন্যদিকে অপরাধীর দম্ভভরা উপস্থিতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। অপরাধীকে যদি অপরাধ করার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির আওতায় আনা যায়, তবেই অপরাধ কমবে। কেবল প্রতিবাদ বা গ্রেফতার করে কোর্টে পাঠালেই অপরাধ দমন হবে না, বরং সময়ক্ষেপণে অপরাধ আরও বাড়বে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত হলে অপরাধীরা দ্বিতীয়বার অপরাধ করার সুযোগ পাবে না। কিন্তু যদি জামিনে দ্রুত বের হয়ে যায়, তবে তারা আবারও অপরাধ সংগঠিত করবে।
গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা কাজে লাগাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করে সঠিকভাবে ব্যবহার করা জরুরি। অন্যথায় অসংখ্য সংবাদমাধ্যম থাকলেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। প্রত্যেককে নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্য কারও ওপর নির্ভর করলে কখনোই অপরাধ দমন সম্ভব হবে না।
পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র—সবই একই সুতোয় গাঁথা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে, কিন্তু শিক্ষায় যদি নৈতিকতা না থাকে তবে সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। আর নৈতিক শিক্ষার অভাবই সমাজে অপরাধ প্রবণতার মূল উৎস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, আশ্রয়দাতা ও অর্থদাতাদের বিচারের আওতায় আনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ।
উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত
আপনার মতামত লিখুন