খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর এক মেজরসহ ১৩ সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয়দের অনেকে।
রোববার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতাল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিশ্চিত করা তথ্যমতে, তিনজনের মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। তাদের শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে। সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।পাহাড়ি এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে শনিবার ভোর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এতে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কসহ আঞ্চলিক সড়কগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
শনিবার দুপুরে খাগড়াছড়ি ও বিকেলে গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি হয়। রাত ১০টার পর পরিস্থিতি শান্ত হলেও রোববার সকাল থেকে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এসময় রামেসু বাজারে আগুন লাগানো হয়। অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে স্থানীয় সূত্র।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘মরদেহ তিনটি খাগড়াছড়ি জেলা হাসপাতালের মর্গে আছে। শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে।’
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাবের জানান, বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে মরদেহ তিনটি ও গুরুতর আহত চারজনকে হাসপাতালে আনা হয়।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, “হতাহতের ব্যাপারে পুলিশ ও হাসপাতাল একসঙ্গে কাজ করছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।”স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহল দিচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।”
‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ তাদের ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সড়ক অবরোধ চলবে এবং পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তাদের চার দফা দাবি হলো:
- ধর্ষণে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
- শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার
- আহতদের যথাযথ চিকিৎসা
- মহাজনপাড়া ও খাগড়াছড়ির অন্যান্য হামলার বিচারের নিশ্চয়তা
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, “আন্দোলনের নামে সহিংসতা তৈরিতে একটি পক্ষ অর্থায়ন করছে। এদের পেছনে কারও ইন্ধন রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করে পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।”
অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ির সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও জেলার ৯ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক রোকন চৌধুরী বলেন, “আলোচনা ছাড়া এ পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব নয়। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া পরিবহন চালু করা কঠিন।”অবরোধে আটকে পড়া দুই হাজারেরও বেশি পর্যটককে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের উদ্যোগে শনিবার গভীর রাতে নিরাপদে ঢাকায় আনা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন