নজর বিডি

খুলনায় শত কোটির মাদকবাজার দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ-দেড় বছরে খুন ৯৫

খুলনায় শত কোটির মাদকবাজার দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ-দেড় বছরে খুন ৯৫

মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের দৌড়ে খুলনায় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও মাসে শত কোটির মাদক বাণিজ্য দখলকে কেন্দ্র করে দেড় বছরে ঘটেছে ৯৫টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড। ছয়টি বাহিনীর মধ্যে দখল–যুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।

একসময় ‘সন্ত্রাসের নগরী’ হিসেবে পরিচিত খুলনা আবার রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। ১৯৯৯–২০০৬ সালের মতোই চরমপন্থী গ্রুপ ও আধিপত্যশীল সন্ত্রাসী বাহিনী ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ববর্তী দমন–অভিযানের কারণে প্রায় ১৫ বছর শান্ত থাকলেও গত দেড় বছরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেছে।

মাদকের ১০০ কোটি টাকার বাজার—মূল সংঘর্ষ এখানেই

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, খুলনায় ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ—
বি কোম্পানি (গ্রেনেড বাবু), হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, পলাশ বাহিনী, নুর আজিম বাহিনী ও আরমান বাহিনী
মাসে কমপক্ষে ৭০–১০০ কোটি টাকার মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রুপগুলোর সংঘর্ষেই গত দেড় বছরে অর্ধশত মানুষ খুন হয়েছে।

দেড় বছরে ৯৫ খুন—নিরাপত্তাহীন শহর

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুলনায় ৯৫টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—যা আগের এক বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে শুধু নগরীতেই ৫০টি খুনের মামলা হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই মাদক সিন্ডিকেট দখল নিয়ে চলমান সংঘর্ষের শিকার।

পুলিশ জানায়, এসব মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; উদ্ধার করা হয়েছে রাইফেল, বিদেশি রিভলভার, পিস্তল, পাইপ গান, শাটার গানসহ বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র। তারপরও অধিকাংশ ‘বড় অস্ত্র’ সন্ত্রাসীদের হাতেই রয়ে গেছে।

অস্ত্র আসছে ভারত থেকে

কেএমপি জানায়, আটক হওয়া বেশিরভাগ অস্ত্রই মেইড ইন ইন্ডিয়া। সীমান্ত নিকটবর্তী হওয়ায় পাচারচক্রের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং ও উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে।

কিশোর গ্যাংদের নীরব নিয়ন্ত্রণ

প্রতিটি বড় বাহিনীর অধীনে রয়েছে নিজস্ব কিশোর গ্যাং। গ্রেনেড বাবুর বাহিনী একাই পাঁচ শতাধিক সদস্য নিয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা এলাকায় হুমা ও আরমান বাহিনীর সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা।

হত্যাকাণ্ডের সাম্প্রতিক উদাহরণ

  • লবণচরা এলাকায় রাজু নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যার চেষ্টা

  • সোনাডাঙ্গার করীমনগরে মাদক ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিনকে বাসায় ঢুকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা

  • একই রাতে নানী–নাতি–নাতনিসহ তিনজনকে নৃশংস হত্যা

এই ধারাবাহিকতায় শহরজুড়ে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে।

পুলিশের অবস্থান

কেএমপি কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন—
‘হত্যাকাণ্ডে প্রশিক্ষিত পেশাদার সন্ত্রাসী জড়িত। গ্রেপ্তার অভিযান চলছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) রাশিদুল ইসলামও স্বীকার করেন—
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়েই বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে।’

কেন নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি?

পুলিশের একটি অংশের ব্যাখ্যা—

  • রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় চক্রগুলো একে অপরকে আক্রমণ করছে

  • ৫ আগস্টের পর আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দুর্বল

  • যৌথ বাহিনীর অভিযানের ঘাটতি

  • সীমান্ত–পথে অস্ত্র ও মাদক পাচার বেড়ে যাওয়া

অনেক কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই নিয়ন্ত্রণহীনতা থামানো কঠিন

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


খুলনায় শত কোটির মাদকবাজার দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ-দেড় বছরে খুন ৯৫

প্রকাশের তারিখ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫

featured Image

মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের দৌড়ে খুলনায় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও মাসে শত কোটির মাদক বাণিজ্য দখলকে কেন্দ্র করে দেড় বছরে ঘটেছে ৯৫টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড। ছয়টি বাহিনীর মধ্যে দখল–যুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।

একসময় ‘সন্ত্রাসের নগরী’ হিসেবে পরিচিত খুলনা আবার রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। ১৯৯৯–২০০৬ সালের মতোই চরমপন্থী গ্রুপ ও আধিপত্যশীল সন্ত্রাসী বাহিনী ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ববর্তী দমন–অভিযানের কারণে প্রায় ১৫ বছর শান্ত থাকলেও গত দেড় বছরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেছে।

মাদকের ১০০ কোটি টাকার বাজার—মূল সংঘর্ষ এখানেই

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, খুলনায় ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ—
বি কোম্পানি (গ্রেনেড বাবু), হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, পলাশ বাহিনী, নুর আজিম বাহিনী ও আরমান বাহিনী
মাসে কমপক্ষে ৭০–১০০ কোটি টাকার মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রুপগুলোর সংঘর্ষেই গত দেড় বছরে অর্ধশত মানুষ খুন হয়েছে।

দেড় বছরে ৯৫ খুন—নিরাপত্তাহীন শহর

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুলনায় ৯৫টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—যা আগের এক বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে শুধু নগরীতেই ৫০টি খুনের মামলা হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই মাদক সিন্ডিকেট দখল নিয়ে চলমান সংঘর্ষের শিকার।

পুলিশ জানায়, এসব মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; উদ্ধার করা হয়েছে রাইফেল, বিদেশি রিভলভার, পিস্তল, পাইপ গান, শাটার গানসহ বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র। তারপরও অধিকাংশ ‘বড় অস্ত্র’ সন্ত্রাসীদের হাতেই রয়ে গেছে।

অস্ত্র আসছে ভারত থেকে

কেএমপি জানায়, আটক হওয়া বেশিরভাগ অস্ত্রই মেইড ইন ইন্ডিয়া। সীমান্ত নিকটবর্তী হওয়ায় পাচারচক্রের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং ও উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে।

কিশোর গ্যাংদের নীরব নিয়ন্ত্রণ

প্রতিটি বড় বাহিনীর অধীনে রয়েছে নিজস্ব কিশোর গ্যাং। গ্রেনেড বাবুর বাহিনী একাই পাঁচ শতাধিক সদস্য নিয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা এলাকায় হুমা ও আরমান বাহিনীর সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা।

হত্যাকাণ্ডের সাম্প্রতিক উদাহরণ

  • লবণচরা এলাকায় রাজু নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যার চেষ্টা

  • সোনাডাঙ্গার করীমনগরে মাদক ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিনকে বাসায় ঢুকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা

  • একই রাতে নানী–নাতি–নাতনিসহ তিনজনকে নৃশংস হত্যা

এই ধারাবাহিকতায় শহরজুড়ে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে।

পুলিশের অবস্থান

কেএমপি কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন—
‘হত্যাকাণ্ডে প্রশিক্ষিত পেশাদার সন্ত্রাসী জড়িত। গ্রেপ্তার অভিযান চলছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) রাশিদুল ইসলামও স্বীকার করেন—
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়েই বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে।’

কেন নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি?

পুলিশের একটি অংশের ব্যাখ্যা—

  • রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় চক্রগুলো একে অপরকে আক্রমণ করছে

  • ৫ আগস্টের পর আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দুর্বল

  • যৌথ বাহিনীর অভিযানের ঘাটতি

  • সীমান্ত–পথে অস্ত্র ও মাদক পাচার বেড়ে যাওয়া

অনেক কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই নিয়ন্ত্রণহীনতা থামানো কঠিন


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত