নজর বিডি

‘এখন আর বড় গরু পালনের সাহস পাই না’

গো-খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি ও লোকসানের ঝুঁকিতে জয়পুরহাটের খামারিরা

গো-খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি ও লোকসানের ঝুঁকিতে জয়পুরহাটের খামারিরা
ছবি: নজরবিডি

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমতে শুরু করেছে জয়পুরহাটের পশুর হাটগুলো। তবে এবারের হাটে আগের বছরগুলোর মতো বিশাল আকৃতির বা ‘মেগা’ সাইজের ষাঁড় গরুর দেখা মিলছে না বললেই চলে। খামারি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, বড় গরু লালন-পালনে অতিরিক্ত খরচ এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফলে ঝুঁকি এড়াতে এখন তারা ছোট ও মাঝারি আকারের গরু পালনের দিকে ঝুঁকছেন।

খামারি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খড়, ভুসি, খৈল ও কাঁচা ঘাসসহ সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এ কারণে বড় গরু পালন এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ক্রেতাদের মধ্যেও বড় গরুর চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে। অধিকাংশ ক্রেতাই এখন বাজেট মিলিয়ে তুলনামূলক কম দামের ছোট ও মাঝারি গরু পছন্দ করছেন।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার খামারি সাগর হোসেন দীর্ঘ ছয় বছর ধরে একটি বিদেশি জাতের বড় ষাঁড় গরু লালন-পালন করেছিলেন। ২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে গরুটির ওজন হয়েছিল প্রায় এক হাজার কেজি। সে সময় বিভিন্ন পাইকার বাড়িতে এসে গরুটির দাম সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বললেও আরও বেশি দামের আশায় তিনি বিক্রি করেননি।

শেষ পর্যন্ত ওই ঈদে গরুটি আর বিক্রি হয়নি। পরে আরও এক বছর অতিরিক্ত লালন-পালন করে গত বছর ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে গরুটি মাত্র ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন সাগর। এই অতিরিক্ত এক বছরে গরুটির পেছনে খাবার ও পরিচর্যায় আরও প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সব মিলিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন তিনি।

খামারি সাগর হোসেন বলেন, "বড় গরু পালনে অনেক খরচ। খাবারের দামও বেশি। আশা ছিল ভালো লাভ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উল্টো লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন আর এত বড় গরু পালনের সাহস পাই না।"

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান জেলার আরেক খামারি সুমন হোসেন। তিনি বলেন, "গত কয়েক বছর বড় ষাঁড় গরু পালন করে আশানুরূপ গ্রাহক মেলেনি, কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যায়নি। এ কারণে এবার খামারে শুধু ছোট ও মাঝামাঝি সাইজের গরু লালন-পালন করেছি।"

জেলার অন্যতম বড় পশুর হাট বসে শহরের নতুনহাট এলাকায়। শনিবার (১৬ মে) সেখানে গিয়ে দেখা যায় কোরবানির কেনাবেচা বেশ জমজমাট। তবে হাটে বড় গরুর আমদানি কম। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন বলেন, "এবার হাটে বেশি ওজনের বড় বড় গরু ওঠেনি। যেসব তুলনামূলক বড় গরু এসেছে, সেগুলোর দাম কম চাওয়া হচ্ছে। বিপরীতে ছোট ও মাঝারি গরুর দাম এবং চাহিদা দুটোই বেশি।"

নতুনহাটের ইজারাদার শামস মতিন জানান, এত আগে স্থানীয় লোকজন সাধারণত কোরবানির গরু কেনেন না। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকার ও ব্যবসায়ীরা গরু কিনছেন। হাটে ভালো সংখ্যক গরু উঠেছে এবং বেচাকেনাও ভালো হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার জয়পুরহাট জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ২ লাখ ৩ হাজার ৩৫০টি। এর বিপরীতে খামারি ও গৃহস্থরা ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৩টি পশু প্রস্তুত করেছেন। ফলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি উদ্বৃত্ত পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জয়পুরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মহির উদ্দিন বলেন, "জেলায় পর্যাপ্ত কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে খামারিরা এখন বাজার চাহিদা বিবেচনা করে ছোট ও মাঝারি গরু বেশি পালন করছেন। বড় গরু পালনে খরচ ও ঝুঁকি দুটিই বেশি হওয়ায় খামারিদের বড় গরু লালন-পালনে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এবার জেলায় বিশাল আকৃতির পশুর সংখ্যা খুবই কম।"

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ জয়পুরহাট, পশুর হাট, কোরবানি ২০২৬, গরু খামারি, গো-খাদ্যের দাম, বড় গরু, নতুনহাট জয়পুরহাট, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, জয়পুরহাটের খবর, খামারি লোকসান Joypurhat, Cattle market, Qurbani 2026, Cow farming, Cattle feed price, Large cows, Joypurhat news, Animal husbandry, Farmer loss

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


গো-খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি ও লোকসানের ঝুঁকিতে জয়পুরহাটের খামারিরা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমতে শুরু করেছে জয়পুরহাটের পশুর হাটগুলো। তবে এবারের হাটে আগের বছরগুলোর মতো বিশাল আকৃতির বা ‘মেগা’ সাইজের ষাঁড় গরুর দেখা মিলছে না বললেই চলে। খামারি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, বড় গরু লালন-পালনে অতিরিক্ত খরচ এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফলে ঝুঁকি এড়াতে এখন তারা ছোট ও মাঝারি আকারের গরু পালনের দিকে ঝুঁকছেন।

খামারি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খড়, ভুসি, খৈল ও কাঁচা ঘাসসহ সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এ কারণে বড় গরু পালন এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ক্রেতাদের মধ্যেও বড় গরুর চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে। অধিকাংশ ক্রেতাই এখন বাজেট মিলিয়ে তুলনামূলক কম দামের ছোট ও মাঝারি গরু পছন্দ করছেন।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার খামারি সাগর হোসেন দীর্ঘ ছয় বছর ধরে একটি বিদেশি জাতের বড় ষাঁড় গরু লালন-পালন করেছিলেন। ২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে গরুটির ওজন হয়েছিল প্রায় এক হাজার কেজি। সে সময় বিভিন্ন পাইকার বাড়িতে এসে গরুটির দাম সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বললেও আরও বেশি দামের আশায় তিনি বিক্রি করেননি।

শেষ পর্যন্ত ওই ঈদে গরুটি আর বিক্রি হয়নি। পরে আরও এক বছর অতিরিক্ত লালন-পালন করে গত বছর ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে গরুটি মাত্র ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন সাগর। এই অতিরিক্ত এক বছরে গরুটির পেছনে খাবার ও পরিচর্যায় আরও প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সব মিলিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন তিনি।

খামারি সাগর হোসেন বলেন, "বড় গরু পালনে অনেক খরচ। খাবারের দামও বেশি। আশা ছিল ভালো লাভ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উল্টো লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন আর এত বড় গরু পালনের সাহস পাই না।"

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান জেলার আরেক খামারি সুমন হোসেন। তিনি বলেন, "গত কয়েক বছর বড় ষাঁড় গরু পালন করে আশানুরূপ গ্রাহক মেলেনি, কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যায়নি। এ কারণে এবার খামারে শুধু ছোট ও মাঝামাঝি সাইজের গরু লালন-পালন করেছি।"

জেলার অন্যতম বড় পশুর হাট বসে শহরের নতুনহাট এলাকায়। শনিবার (১৬ মে) সেখানে গিয়ে দেখা যায় কোরবানির কেনাবেচা বেশ জমজমাট। তবে হাটে বড় গরুর আমদানি কম। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন বলেন, "এবার হাটে বেশি ওজনের বড় বড় গরু ওঠেনি। যেসব তুলনামূলক বড় গরু এসেছে, সেগুলোর দাম কম চাওয়া হচ্ছে। বিপরীতে ছোট ও মাঝারি গরুর দাম এবং চাহিদা দুটোই বেশি।"

নতুনহাটের ইজারাদার শামস মতিন জানান, এত আগে স্থানীয় লোকজন সাধারণত কোরবানির গরু কেনেন না। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকার ও ব্যবসায়ীরা গরু কিনছেন। হাটে ভালো সংখ্যক গরু উঠেছে এবং বেচাকেনাও ভালো হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার জয়পুরহাট জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ২ লাখ ৩ হাজার ৩৫০টি। এর বিপরীতে খামারি ও গৃহস্থরা ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৩টি পশু প্রস্তুত করেছেন। ফলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি উদ্বৃত্ত পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জয়পুরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মহির উদ্দিন বলেন, "জেলায় পর্যাপ্ত কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে খামারিরা এখন বাজার চাহিদা বিবেচনা করে ছোট ও মাঝারি গরু বেশি পালন করছেন। বড় গরু পালনে খরচ ও ঝুঁকি দুটিই বেশি হওয়ায় খামারিদের বড় গরু লালন-পালনে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এবার জেলায় বিশাল আকৃতির পশুর সংখ্যা খুবই কম।"


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত