চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালায় একটি ইটভাটার সংলগ্ন ফসলি জমির আম ও ধান চাষিরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার পর অবশেষে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় ভাটা মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে এই নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়।
চাষিরা জানান, জেলাজুড়ে দেড় শতাধিক ইটভাটার কারণে প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, কৃষকদের এভাবে ডেকে এনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘটনা জেলায় এটাই প্রথম।
জানা যায়, চৌডালা ইউনিয়নের নন্দলালপুর মাঠে অবস্থিত ‘এএনএফ ব্রিকস’ নামের ইটভাটাটি প্রায় দেড় যুগ ধরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। চলতি বছর ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভাটা সংলগ্ন এলাকার ধান ও আম চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েন। বিষয়টি কৃষকরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে জানালে, সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে একটি দল সরেজমিনে তদন্ত করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে। এরপর সেই তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের হাতে ক্ষতিপূরণ তুলে দেওয়া হয়, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম ও ধানে ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে আসছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় হাজারো অভিযোগ দিলেও সাধারণত কোনো তোয়াক্কা করা হতো না। তবে এবার ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা বিবেচনা করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের ধানের জমিতে বিঘাপ্রতি ১২ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। জেলার অন্যান্য দেড় শতাধিক ইটভাটার আশেপাশে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও সমভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চৌডালা ইউনিয়নের নন্দলালপুর গ্রামের কৃষক তাজেমুল হক বলেন, "ইটভাটার পাশে আমার ২ বিঘা ধান ও ৭ বিঘা আমবাগান রয়েছে। ধানে এবার একটু বেশি ক্ষতি হয়েছিল। বিষয়টি ইউপি সদস্যকে জানানোর পর আমরা যে পরিমাণ দাবি করেছিলাম, যাচাই-বাছাই করে সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ, এতদিন হাজারো ক্ষয়ক্ষতি হলেও আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি।"
একই এলাকার গুরজঘাট গ্রামের কৃষক মো. ধুলু জানান, তাঁর ২ বিঘা ধানের জমি রয়েছে ইটভাটার পাশে। তিনি বলেন, "ইটভাটা থাকলে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এএনএফ ব্রিকস কয়লাভিত্তিক ভাটা হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তারপরও যেটুকু ক্ষতি হয়েছিল, ভাটা মালিক বসে সেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিয়েছেন। জমিতে সার ও কীটনাশকের পুরো খরচই তাঁরা বহন করেছেন।"
এএনএফ ব্রিকসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী নাজমুল আলম বলেন, "যেসব কৃষক তাঁদের ফসলের ক্ষতির বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন, তদন্ত সাপেক্ষ তাঁদের প্রত্যেককেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু আশেপাশের কৃষকরা আমাদের নিজ এলাকারই মানুষ, তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। জেলায় আমরাই প্রথম এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম, যাতে অন্য ভাটা মালিকেরাও তা অনুসরণ করেন। তাছাড়া, পরিবেশের ক্ষতির কথা চিন্তা করে আমাদের ভাটায় কোনো খড়ি (কাঠ) পোড়ানো হয় না।"
চৌডালা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, কৃষকেরা ক্ষতির বিষয়টি জানানোর পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি সমাধান বৈঠক করা হয়। এরপর একটি কমিটি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা বুঝিয়ে দেয়। ক্ষতিপূরণের নগদ অর্থ বুঝে পাওয়ার পর কৃষকেরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁদের আর কোনো অভিযোগ নেই মর্মে অনাপত্তি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগে ৩০ জনেরও বেশি ধানচাষী এবং ২০ জনেরও বেশি আমচাষী সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন হোসেন বলেন, "ইটভাটা এলাকাটি আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বেশ কিছু কৃষক ইতিমধ্যেই তাঁদের ক্ষতিপূরণ বুঝে পাওয়ার বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ইটভাটার ধোঁয়ায় ধান ও আমসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় এই ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি লাভবান হবেন।"
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ কৃষক ক্ষতিপূরণ, ইটভাটা দূষণ, ফসলের ক্ষতিপূরণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, চৌডালা ইউনিয়ন, এএনএফ ব্রিকস, ধান চাষি, আম চাষি, কৃষি সংবাদ, স্থানীয় খবর Farmer Compensation, Brick Kiln Pollution, Crop Damage Compensation, Chapainawabganj, Gomastapur, Choudala Union, ANF Bricks, Rice Farmers, Mango Orchard, Agricultural News, Local News

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালায় একটি ইটভাটার সংলগ্ন ফসলি জমির আম ও ধান চাষিরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার পর অবশেষে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় ভাটা মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে এই নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়।
চাষিরা জানান, জেলাজুড়ে দেড় শতাধিক ইটভাটার কারণে প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, কৃষকদের এভাবে ডেকে এনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘটনা জেলায় এটাই প্রথম।
জানা যায়, চৌডালা ইউনিয়নের নন্দলালপুর মাঠে অবস্থিত ‘এএনএফ ব্রিকস’ নামের ইটভাটাটি প্রায় দেড় যুগ ধরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। চলতি বছর ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভাটা সংলগ্ন এলাকার ধান ও আম চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েন। বিষয়টি কৃষকরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে জানালে, সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে একটি দল সরেজমিনে তদন্ত করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে। এরপর সেই তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের হাতে ক্ষতিপূরণ তুলে দেওয়া হয়, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম ও ধানে ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে আসছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় হাজারো অভিযোগ দিলেও সাধারণত কোনো তোয়াক্কা করা হতো না। তবে এবার ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা বিবেচনা করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের ধানের জমিতে বিঘাপ্রতি ১২ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। জেলার অন্যান্য দেড় শতাধিক ইটভাটার আশেপাশে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও সমভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চৌডালা ইউনিয়নের নন্দলালপুর গ্রামের কৃষক তাজেমুল হক বলেন, "ইটভাটার পাশে আমার ২ বিঘা ধান ও ৭ বিঘা আমবাগান রয়েছে। ধানে এবার একটু বেশি ক্ষতি হয়েছিল। বিষয়টি ইউপি সদস্যকে জানানোর পর আমরা যে পরিমাণ দাবি করেছিলাম, যাচাই-বাছাই করে সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ, এতদিন হাজারো ক্ষয়ক্ষতি হলেও আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি।"
একই এলাকার গুরজঘাট গ্রামের কৃষক মো. ধুলু জানান, তাঁর ২ বিঘা ধানের জমি রয়েছে ইটভাটার পাশে। তিনি বলেন, "ইটভাটা থাকলে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এএনএফ ব্রিকস কয়লাভিত্তিক ভাটা হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তারপরও যেটুকু ক্ষতি হয়েছিল, ভাটা মালিক বসে সেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিয়েছেন। জমিতে সার ও কীটনাশকের পুরো খরচই তাঁরা বহন করেছেন।"
এএনএফ ব্রিকসের অন্যতম স্বত্বাধিকারী নাজমুল আলম বলেন, "যেসব কৃষক তাঁদের ফসলের ক্ষতির বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন, তদন্ত সাপেক্ষ তাঁদের প্রত্যেককেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু আশেপাশের কৃষকরা আমাদের নিজ এলাকারই মানুষ, তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। জেলায় আমরাই প্রথম এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম, যাতে অন্য ভাটা মালিকেরাও তা অনুসরণ করেন। তাছাড়া, পরিবেশের ক্ষতির কথা চিন্তা করে আমাদের ভাটায় কোনো খড়ি (কাঠ) পোড়ানো হয় না।"
চৌডালা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, কৃষকেরা ক্ষতির বিষয়টি জানানোর পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি সমাধান বৈঠক করা হয়। এরপর একটি কমিটি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা বুঝিয়ে দেয়। ক্ষতিপূরণের নগদ অর্থ বুঝে পাওয়ার পর কৃষকেরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁদের আর কোনো অভিযোগ নেই মর্মে অনাপত্তি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগে ৩০ জনেরও বেশি ধানচাষী এবং ২০ জনেরও বেশি আমচাষী সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন হোসেন বলেন, "ইটভাটা এলাকাটি আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বেশ কিছু কৃষক ইতিমধ্যেই তাঁদের ক্ষতিপূরণ বুঝে পাওয়ার বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ইটভাটার ধোঁয়ায় ধান ও আমসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় এই ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি লাভবান হবেন।"

আপনার মতামত লিখুন