২০২৬ সালের ৪ জুন। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর আকাশে যখন ভোরের আলো ফুটছিল, তখনই একটি শহরের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সমস্ত চেষ্টা আকস্মিকভাবে থমকে যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নাগরিকদের কর্মব্যস্ততা কিংবা সাম্প্রতিক দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মচঞ্চলতার চিরাচরিত শব্দের পরিবর্তে পুরো শহর কেঁপে ওঠে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের মুহুর্মুহু গর্জন আর ভারী মর্টারের গোলার বিকট আওয়াজে।
বহুবছর পর, যখন দেশটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মোগাদিশুর রাস্তায় আবারও ফিরে এসেছে নগর-যুদ্ধের (urban warfare) সেই চেনা নৃশংসতা।
আন্তর্জাতিক মহলের কোনো কোনো পর্যবেক্ষক একে হয়তো কেবলই সাময়িক একটি স্থানীয় সংঘাত হিসেবে এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো, এটি আসলে সোমালিয়ার একটি গভীর সাংবিধানিক ও কাঠামোগত সংকট, যা সমগ্র হর্ন অব আফ্রিকা (Horn of Africa) অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমান এই চরম উত্তেজনার তাত্ক্ষণিক কারণটি নিহিত রয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ political stalemate বা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে।
২০২৬ সালের ১৫ মে প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহাম্মদের সাংবিধানিক মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী খাইরে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট শরিফ শেখ আহমেদের নেতৃত্বাধীন দেশের একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের মতে—বর্তমান প্রশাসনের দেশ পরিচালনার সমস্ত বৈধ আইনি অধিকার এখন সমাপ্ত।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন ফেডারেল সরকার চলতি বছরের শুরুতে পার্লামেন্টে পাস হওয়া একটি বিতর্কিত এবং একতরফা সংশোধনীর ওপর জোর দিচ্ছে। সরকারের দাবি, এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী সংস্কার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে executive branch বা নির্বাহী বিভাগকে আরও এক বছরের বাড়তি মেয়াদ দেওয়া হয়েছে।
এই আইনি বিরোধটি আসলে একটি টাইম-বোমা ছিল, যা অবশেষে গত ৩ জুন সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিরোধী দলগুলোর পূর্বপরিকল্পিত একটি বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঠিক আগমুহূর্তে, ফেডারেল নিরাপত্তা বাহিনী শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতাদের সুরক্ষিত বাসভবনগুলো সামরিকভাবে অবরুদ্ধ করে ফেলে।
বিরোধী দলগুলো একে শক্তির জোরে ভিন্নমত doushon বা দমনের একটি স্বৈরাচারী চেষ্টা হিসেবে গণ্য করে পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করে। শক্তিশালী গোত্র-ভিত্তিক মিলিশিয়ারা (clan-aligned militias) দ্রুত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ‘ভিলা সোমালিয়ার’ চারপাশের কৌশলগত এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ গড়ে তোলে।
এই সংকটের গভীরতা সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য আমাদের পেছনের বিস্তৃত পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত ত্রুটিগুলো বুঝতে হবে, যা মূলত রাজনৈতিক ঐকমত্যের একটি বহুমাত্রিক ব্যর্থতা:
| সংকটের মূল উৎস | সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব |
| একতরফা নির্বাচনী সংস্কার | দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী গোত্র-ভিত্তিক পরোক্ষ ভোটাধিকার ব্যবস্থার পরিবর্তে সরকার কেন্দ্রীয় ‘এক ব্যক্তি, এক vote’ পদ্ধতির প্রত্যক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করেছে। তবে বিরোধী দল এবং পুন্টল্যান্ড ও জুবাল্যান্ডের মতো স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোর মতে, এই কাঠামোটি আসলে ক্ষমতাকে কেন্দ্রভূত করার এবং নাজুক ফেডারেল ভারসাম্যকে ধ্বংস করার সুকৌশলী চেষ্টা। |
| নিরাপত্তা বাহিনীর বিভাজন | সোমালিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী (SNA) বা পুলিশ বাহিনী কোনো একক অবিভাজ্য সত্তা নয়। তাদের ভেতরের ঐক্য পুরোপুরি নির্ভর করে রাষ্ট্রের আইনি বৈধতার প্রতি যৌথ বিশ্বাসের ওপর। বৈধতা বিলুপ্ত হলে সৈন্যরা স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ উপ-গোত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়, যা দেশকে আবারও আঞ্চলিক যুদ্ধবাজদের (warlordism) অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারে। |
| আল-শাবাবের পুনরুত্থান | মার্কিন embassy ও যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই গৃহযুদ্ধ আল-কায়েদার সহযোগী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আল-শাবাব’-এর জন্য একটি বিরাট কৌশলগত উপহার। মোগাদিশুর প্রাণকেন্দ্রে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। |
| মানবিক বিপর্যয় | প্রাতিষ্ঠানিক এই ব্যর্থতার মানবিক মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ। মোগাদিশুর ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকা, বিশেষ করে ‘হাউল ওয়াদাগ’ এবং ‘আব্দিয়াসিস’ জেলাগুলো এখন ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। আবাসিক ব্লকের ওপর মর্টারের গোলা আছড়ে পড়ায় জীবন বাঁচাতে মধ্যরাতে দলে দলে পরিবারগুলোকে পালিয়ে যেতে হচ্ছে। |
"দশকের পর দশক ধরে ট্রমা সহ্য করা একটি জনগোষ্ঠী যখন তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্ন ভুলে আবারও স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়—তখন তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সোমালিয়ার এই দুঃখজনক পরিস্থিতি একটি গভীর ঐতিহাসিক আবেগের জন্ম দেয়। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জাতিসংঘের ‘ইউনোসম’ (UNOSOM) মিশনের অধীনে এই পূর্ব আফ্রিকান দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের এক আত্মিক ও রক্তের বন্ধন তৈরি হয়েছিল।
সে সময় বাংলাদেশের হাজার হাজার বীর ‘ব্লু হেলমেট’ বা শান্তিরক্ষী মোগাদিশুর এই রক্তাক্ত ও উত্তপ্ত রাস্তায় হেঁটেছিলেন। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছিলেন এবং সোমালিয়ার মৌলিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করেছিলেন।
সোমালিয়ার মাটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য এই মাটিতেই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, শাহাদাত বরণ করেছেন। আজ যখন সোমালিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে দশকের পর দশক ধরে অর্জিত সেই শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে এভাবে ধূলিসাৎ করতে দেখা যায়—যা অর্জনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদেরও রক্ত ও ঘাম জড়িয়ে রয়েছে—তখন তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক।
আমরা এখন ইতিহাসের এক অত্যন্ত নাজুক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বন্দুকের নল কখনো সংবিধান তৈরি করতে পারে না, আর কামানের গোলা দিয়ে কখনো ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদের প্রশাসন যদি এভাবে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার চালিয়ে যেতে থাকে এবং বিরোধী দলগুলো যদি তাদের সশস্ত্র মহড়া বন্ধ না করে, তবে মোগাদিশু এমন এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, যা কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমে গড়া এই রাষ্ট্রটিকে আবারও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে।
এই মুহূর্তে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র কার্যকর পথ হলো—একটি তাৎক্ষণিক ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা। এরপর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে একটি জরুরি জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা।
সোমালিয়ার নেতাদের নিজেদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে প্রাধান্য দিতে হবে। মোগাদিশুর রাস্তাগুলো যেন নাগরিকদের সমৃদ্ধি অর্জনের পথ হয়, ক্ষমতার লড়াইয়ে নিষ্পাপ বেসামরিক মানুষের কবরস্থান যেন না হয়।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
২০২৬ সালের ৪ জুন। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর আকাশে যখন ভোরের আলো ফুটছিল, তখনই একটি শহরের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সমস্ত চেষ্টা আকস্মিকভাবে থমকে যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নাগরিকদের কর্মব্যস্ততা কিংবা সাম্প্রতিক দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মচঞ্চলতার চিরাচরিত শব্দের পরিবর্তে পুরো শহর কেঁপে ওঠে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের মুহুর্মুহু গর্জন আর ভারী মর্টারের গোলার বিকট আওয়াজে।
বহুবছর পর, যখন দেশটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মোগাদিশুর রাস্তায় আবারও ফিরে এসেছে নগর-যুদ্ধের (urban warfare) সেই চেনা নৃশংসতা।
আন্তর্জাতিক মহলের কোনো কোনো পর্যবেক্ষক একে হয়তো কেবলই সাময়িক একটি স্থানীয় সংঘাত হিসেবে এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো, এটি আসলে সোমালিয়ার একটি গভীর সাংবিধানিক ও কাঠামোগত সংকট, যা সমগ্র হর্ন অব আফ্রিকা (Horn of Africa) অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমান এই চরম উত্তেজনার তাত্ক্ষণিক কারণটি নিহিত রয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ political stalemate বা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে।
২০২৬ সালের ১৫ মে প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহাম্মদের সাংবিধানিক মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী খাইরে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট শরিফ শেখ আহমেদের নেতৃত্বাধীন দেশের একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের মতে—বর্তমান প্রশাসনের দেশ পরিচালনার সমস্ত বৈধ আইনি অধিকার এখন সমাপ্ত।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন ফেডারেল সরকার চলতি বছরের শুরুতে পার্লামেন্টে পাস হওয়া একটি বিতর্কিত এবং একতরফা সংশোধনীর ওপর জোর দিচ্ছে। সরকারের দাবি, এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী সংস্কার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে executive branch বা নির্বাহী বিভাগকে আরও এক বছরের বাড়তি মেয়াদ দেওয়া হয়েছে।
এই আইনি বিরোধটি আসলে একটি টাইম-বোমা ছিল, যা অবশেষে গত ৩ জুন সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিরোধী দলগুলোর পূর্বপরিকল্পিত একটি বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঠিক আগমুহূর্তে, ফেডারেল নিরাপত্তা বাহিনী শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতাদের সুরক্ষিত বাসভবনগুলো সামরিকভাবে অবরুদ্ধ করে ফেলে।
বিরোধী দলগুলো একে শক্তির জোরে ভিন্নমত doushon বা দমনের একটি স্বৈরাচারী চেষ্টা হিসেবে গণ্য করে পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করে। শক্তিশালী গোত্র-ভিত্তিক মিলিশিয়ারা (clan-aligned militias) দ্রুত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ‘ভিলা সোমালিয়ার’ চারপাশের কৌশলগত এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ গড়ে তোলে।
এই সংকটের গভীরতা সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য আমাদের পেছনের বিস্তৃত পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত ত্রুটিগুলো বুঝতে হবে, যা মূলত রাজনৈতিক ঐকমত্যের একটি বহুমাত্রিক ব্যর্থতা:
| সংকটের মূল উৎস | সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব |
| একতরফা নির্বাচনী সংস্কার | দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী গোত্র-ভিত্তিক পরোক্ষ ভোটাধিকার ব্যবস্থার পরিবর্তে সরকার কেন্দ্রীয় ‘এক ব্যক্তি, এক vote’ পদ্ধতির প্রত্যক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করেছে। তবে বিরোধী দল এবং পুন্টল্যান্ড ও জুবাল্যান্ডের মতো স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোর মতে, এই কাঠামোটি আসলে ক্ষমতাকে কেন্দ্রভূত করার এবং নাজুক ফেডারেল ভারসাম্যকে ধ্বংস করার সুকৌশলী চেষ্টা। |
| নিরাপত্তা বাহিনীর বিভাজন | সোমালিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী (SNA) বা পুলিশ বাহিনী কোনো একক অবিভাজ্য সত্তা নয়। তাদের ভেতরের ঐক্য পুরোপুরি নির্ভর করে রাষ্ট্রের আইনি বৈধতার প্রতি যৌথ বিশ্বাসের ওপর। বৈধতা বিলুপ্ত হলে সৈন্যরা স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ উপ-গোত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়, যা দেশকে আবারও আঞ্চলিক যুদ্ধবাজদের (warlordism) অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারে। |
| আল-শাবাবের পুনরুত্থান | মার্কিন embassy ও যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই গৃহযুদ্ধ আল-কায়েদার সহযোগী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আল-শাবাব’-এর জন্য একটি বিরাট কৌশলগত উপহার। মোগাদিশুর প্রাণকেন্দ্রে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। |
| মানবিক বিপর্যয় | প্রাতিষ্ঠানিক এই ব্যর্থতার মানবিক মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ। মোগাদিশুর ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকা, বিশেষ করে ‘হাউল ওয়াদাগ’ এবং ‘আব্দিয়াসিস’ জেলাগুলো এখন ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। আবাসিক ব্লকের ওপর মর্টারের গোলা আছড়ে পড়ায় জীবন বাঁচাতে মধ্যরাতে দলে দলে পরিবারগুলোকে পালিয়ে যেতে হচ্ছে। |
"দশকের পর দশক ধরে ট্রমা সহ্য করা একটি জনগোষ্ঠী যখন তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্ন ভুলে আবারও স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়—তখন তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সোমালিয়ার এই দুঃখজনক পরিস্থিতি একটি গভীর ঐতিহাসিক আবেগের জন্ম দেয়। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জাতিসংঘের ‘ইউনোসম’ (UNOSOM) মিশনের অধীনে এই পূর্ব আফ্রিকান দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের এক আত্মিক ও রক্তের বন্ধন তৈরি হয়েছিল।
সে সময় বাংলাদেশের হাজার হাজার বীর ‘ব্লু হেলমেট’ বা শান্তিরক্ষী মোগাদিশুর এই রক্তাক্ত ও উত্তপ্ত রাস্তায় হেঁটেছিলেন। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছিলেন এবং সোমালিয়ার মৌলিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করেছিলেন।
সোমালিয়ার মাটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য এই মাটিতেই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, শাহাদাত বরণ করেছেন। আজ যখন সোমালিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে দশকের পর দশক ধরে অর্জিত সেই শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে এভাবে ধূলিসাৎ করতে দেখা যায়—যা অর্জনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদেরও রক্ত ও ঘাম জড়িয়ে রয়েছে—তখন তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক।
আমরা এখন ইতিহাসের এক অত্যন্ত নাজুক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বন্দুকের নল কখনো সংবিধান তৈরি করতে পারে না, আর কামানের গোলা দিয়ে কখনো ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদের প্রশাসন যদি এভাবে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার চালিয়ে যেতে থাকে এবং বিরোধী দলগুলো যদি তাদের সশস্ত্র মহড়া বন্ধ না করে, তবে মোগাদিশু এমন এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, যা কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমে গড়া এই রাষ্ট্রটিকে আবারও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে।
এই মুহূর্তে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র কার্যকর পথ হলো—একটি তাৎক্ষণিক ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা। এরপর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে একটি জরুরি জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা।
সোমালিয়ার নেতাদের নিজেদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে প্রাধান্য দিতে হবে। মোগাদিশুর রাস্তাগুলো যেন নাগরিকদের সমৃদ্ধি অর্জনের পথ হয়, ক্ষমতার লড়াইয়ে নিষ্পাপ বেসামরিক মানুষের কবরস্থান যেন না হয়।

আপনার মতামত লিখুন