নজর বিডি
প্রকাশ : বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

প্রতিবেশীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেশীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ

৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক রেখামাত্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর মতো একতরফা ও অনিয়মিত চর্চা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার জায়গাকে সংকীর্ণ করে তুলছে। 

আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের আলোকে এই সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এবং একটি টেকসই ও মানবিক রূপরেখা এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একটি অনন্য ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। এই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত কেবল দুটি দেশের মানচিত্রকেই পৃথক করেনি, বরং দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মনস্তত্ত্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এই সম্পর্কের অজস্র ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা- বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ (Pushback) এবং ‘পুশইন’ (Push-in)-এর ঘটনাপ্রবাহ- উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি grande কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে। সমসাময়িক রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় বয়ান, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ- এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অদৃশ্য অথচ অস্থির মনস্তাত্ত্বিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে ‘পুশব্যাক’ এবং ‘পুশইন’ শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো।

এটি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও একতরফা কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে ‘পুশইন’ বলা হয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' (Non-refoulement) নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (OHCHR) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই একতরফা চর্চা সরাসরি 'আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি' (ICCPR)-এর চরম লঙ্ঘন, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে।

সীমান্তের এই সংকটকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে বিশ্লেষণ করলে এর তিনটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আঞ্চলিক হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ, বলপ্রয়োগের একতরফা রাজনীতি, এবং 'স্টেট অব এক্সেপশন' ও 'বেয়ার লাইফ'-এর অবতারণা।

ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' (Hegemony) বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বজায় রাখে। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশব্যাক বা পুশইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর 'বায়োপলিটিক্স' (Biopolitics) তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকে ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশইন বা পুশব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে। ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' (State of Exception) বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে পুশব্যাকের শিকার মানুষগুলো পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' (Bare Life) বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে।

বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। একে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়:

ঐতিহাসিক পর্যায়মূল ঘটনা ও প্রভাবদ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবস্থা
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১র‍্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়, যার একটি বড় অংশের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়।ঐতিহাসিক নির্ভরশীলতা: জীবন ও সংস্কৃতির গভীর যোগাযোগ, তবে সীমানা নিয়ে এক ধরনের অন্তর্নিহিত uncertainty বা অনিশ্চয়তা।
১৯৭৪-এর চুক্তি ও পরবর্তী শূন্যতাঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি'র দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়। এই দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে।প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব: দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষাকে একপাক্ষিক ও সামরিকায়িত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।
২০০৩-বর্তমান (পুশব্যাক ও সংকট)২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফ-এর মধ্যে তীব্র সংঘাতের জন্ম দেয়। বর্তমানে এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) এর কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে।কাঠামোগত দ্বন্দ্ব: একতরফা বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক ডিপ্লোম্যাটিক অনাস্থার ক্রমান্বয় বৃদ্ধি।

এই সীমান্ত সংকটের পেছনে মূলত তিনটি চালিকাশক্তি কাজ করছে, বিশেষ করে আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (NRC) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (CAA) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে প্রায়শই একতরফা ও aggression বা আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর অবস্থান হলো—কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। भौगोलिक সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সংকট হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক (Formal) প্রতিশ্রুতির সাথে মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল (Informal) আচরণের বৈপরীত্য।

দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে ভারত এবং বাংলাদেশ যখন যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে, তখন "পারস্পরিক সহযোগিতা", "সীমান্তে শূন্য মৃত্যু" কিংবা "শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা"র মতো গালভরা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বাস্তবতায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো পূর্ব ঘোষণা, আইনি নোটিশ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বিএসএফের মাধ্যমে পুশইন বা পুশব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ভারতের এই অনানুষ্ঠানিক আচরণ তার প্রতিবেশীদের সাথে 'প্যারেন্টাল' বা অভিভাবকসুলভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলদর্পী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বিমুখী আচরণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে। এর প্রভাব মূলত দুটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান:

বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক (Factor)। ভারতের একতরফা পুশইন ও পুশব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়। এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার, তখন সীমান্তে ভারতের এই অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে।

সীমান্তে পুশইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস। এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' বয়ান বা ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট উত্তরণের কৌশলগত রোডম্যাপ হতে পারে নিম্নরূপ:

ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়াল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নো-ম্যানস ল্যান্ড' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দেওয়া অপরিহার্য।

সীমান্ত হত্যা এবং পুশব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (JCC) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।

ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশইন ও পুশব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, সীমান্ত সংকট, পুশব্যাক, পুশইন, বিএসএফ, বিজিবি, ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, ড. আসিফ মিজান, দক্ষিণ এশিয়া Bangladesh-India Relations, Border Crisis, Pushback, Push-in, BSF, BGB, Geo-politics, International Law, Dr. Asif Mizan, South Asia

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


প্রতিবেশীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image

৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক রেখামাত্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর মতো একতরফা ও অনিয়মিত চর্চা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার জায়গাকে সংকীর্ণ করে তুলছে। 

আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের আলোকে এই সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এবং একটি টেকসই ও মানবিক রূপরেখা এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একটি অনন্য ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। এই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত কেবল দুটি দেশের মানচিত্রকেই পৃথক করেনি, বরং দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মনস্তত্ত্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এই সম্পর্কের অজস্র ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা- বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ (Pushback) এবং ‘পুশইন’ (Push-in)-এর ঘটনাপ্রবাহ- উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি grande কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে। সমসাময়িক রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় বয়ান, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ- এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অদৃশ্য অথচ অস্থির মনস্তাত্ত্বিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে ‘পুশব্যাক’ এবং ‘পুশইন’ শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো।

এটি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও একতরফা কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে ‘পুশইন’ বলা হয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' (Non-refoulement) নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (OHCHR) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই একতরফা চর্চা সরাসরি 'আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি' (ICCPR)-এর চরম লঙ্ঘন, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে।

সীমান্তের এই সংকটকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে বিশ্লেষণ করলে এর তিনটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আঞ্চলিক হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ, বলপ্রয়োগের একতরফা রাজনীতি, এবং 'স্টেট অব এক্সেপশন' ও 'বেয়ার লাইফ'-এর অবতারণা।

ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' (Hegemony) বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বজায় রাখে। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশব্যাক বা পুশইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর 'বায়োপলিটিক্স' (Biopolitics) তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকে ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশইন বা পুশব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে। ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' (State of Exception) বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে পুশব্যাকের শিকার মানুষগুলো পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' (Bare Life) বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে।

বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। একে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়:

ঐতিহাসিক পর্যায়মূল ঘটনা ও প্রভাবদ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবস্থা
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১র‍্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়, যার একটি বড় অংশের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়।ঐতিহাসিক নির্ভরশীলতা: জীবন ও সংস্কৃতির গভীর যোগাযোগ, তবে সীমানা নিয়ে এক ধরনের অন্তর্নিহিত uncertainty বা অনিশ্চয়তা।
১৯৭৪-এর চুক্তি ও পরবর্তী শূন্যতাঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি'র দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়। এই দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে।প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব: দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষাকে একপাক্ষিক ও সামরিকায়িত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।
২০০৩-বর্তমান (পুশব্যাক ও সংকট)২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফ-এর মধ্যে তীব্র সংঘাতের জন্ম দেয়। বর্তমানে এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) এর কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে।কাঠামোগত দ্বন্দ্ব: একতরফা বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার সংকট ও দ্বিপাক্ষিক ডিপ্লোম্যাটিক অনাস্থার ক্রমান্বয় বৃদ্ধি।

এই সীমান্ত সংকটের পেছনে মূলত তিনটি চালিকাশক্তি কাজ করছে, বিশেষ করে আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (NRC) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (CAA) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে প্রায়শই একতরফা ও aggression বা আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর অবস্থান হলো—কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। भौगोलिक সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সংকট হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক (Formal) প্রতিশ্রুতির সাথে মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল (Informal) আচরণের বৈপরীত্য।

দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে ভারত এবং বাংলাদেশ যখন যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে, তখন "পারস্পরিক সহযোগিতা", "সীমান্তে শূন্য মৃত্যু" কিংবা "শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা"র মতো গালভরা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বাস্তবতায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো পূর্ব ঘোষণা, আইনি নোটিশ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বিএসএফের মাধ্যমে পুশইন বা পুশব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ভারতের এই অনানুষ্ঠানিক আচরণ তার প্রতিবেশীদের সাথে 'প্যারেন্টাল' বা অভিভাবকসুলভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলদর্পী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বিমুখী আচরণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে। এর প্রভাব মূলত দুটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান:

বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক (Factor)। ভারতের একতরফা পুশইন ও পুশব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়। এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার, তখন সীমান্তে ভারতের এই অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে।

সীমান্তে পুশইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস। এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' বয়ান বা ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট উত্তরণের কৌশলগত রোডম্যাপ হতে পারে নিম্নরূপ:

ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়াল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নো-ম্যানস ল্যান্ড' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দেওয়া অপরিহার্য।

সীমান্ত হত্যা এবং পুশব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (JCC) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।

ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশইন ও পুশব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত