নজর বিডি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

বিচারহীনতার আবর্ত ও ‘সাপ-লুডু’ খেলা: কার দায়

বিচারহীনতার আবর্ত ও ‘সাপ-লুডু’ খেলা: কার দায়

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, দুর্ধর্ষ অপরাধীর গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী সময়ে আদালতের আইনি মারপ্যাঁচে তার অনায়াস মুক্তি—বাংলাদেশের অপরাধচিত্র ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় এটি যেন এক অন্তহীন ‘সাপ-লুডু’ খেলা। 

এই প্রাতিষ্ঠানিক খেলায় পুলিশ যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে ওপরে ওঠে, তখন আইনের ফাঁকফোকরের সাপটি অপরাধীকে গিলে ফেলে আবার পূর্বের অবস্থানে নামিয়ে আনে।

দাগি আসামি, খুনি, চরম দুর্নীতিবাজ কিংবা মাদকসম্রাটদের আইনের আওতায় আনা যেকোনো সুসভ্য সমাজের জন্যই কঠিনতম কাজ। গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সর্বোচ্চ ব্যবহার আর দিনরাত এক করে পুলিশ বা যৌথবাহিনী যখন এদের খাঁচায় বন্দি করে, তখন চারদিকে বাহবা রব ওঠে, প্রশংসায় ভাসতে থাকেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা 'শাস্তির নিশ্চয়তা' (Certainty of Punishment) বলি, তার অনুপস্থিতির কারণে এই স্বস্তির আয়ুষ্কাল বড্ড সংক্ষিপ্ত হয়।

গ্রেপ্তারের পরপরই দৃশ্যপটে হাজির হয় আদালত পাড়ার এক ভিন্ন সামাজিক ও আইনি বাস্তবতা। ঝানু অপরাধ আইনজীবীরা আইনি সুরক্ষার ঢাল ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে মাঠে নামেন। আইনের চুলচেরা विश्लेषण আর টেকনিক্যাল মারপ্যাঁচে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সফল অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তারা অপরাধীকে মুক্ত করে আনেন।

জামিনে বেরিয়ে এই জঘন্য অপরাধীরা যখন আবার সদর্পে তাদের পুরনো অন্ধকার সাম্রাজ্যে ফিরে যায়, তখন ভেঙে পড়ে দেশপ্রেমিক সৎ পুলিশ অফিসারদের পেশাগত মনোবল। অপরাধ বিজ্ঞানের 'ডিটারেন্স থিওরি' (Deterrence Theory) বা প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব অনুযায়ী, শাস্তির ভয় যখন মন থেকে উঠে যায়, তখন অপরাধ প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য অপরাধীদের সাথে হাত মেলায়। ফলে অনৈতিকতার এক বৃত্তাকার আবর্তে সমাজ সেই তিমিরেই থেকে যায়। সচেতন নাগরিকেরা কেবল নির্বাক দর্শক হয়ে হতাশা প্রকাশ করেন, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কাছে তাদের কিছুই করার থাকে না।

গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক কিছু ভয়াবহ চিত্র এই ‘সাপ-লুডু’ খেলার নির্মম সত্য ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে (Culture of Impunity) প্রমাণ করে। প্রথম আলো ও বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সাম্প্রতিক political পটপরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলার রূপান্তরের সুযোগ নিয়ে কয়েক শত দুর্ধর্ষ অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারামুক্ত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম এবং মিরপুরের আতঙ্ক কিলার আব্বাস বছরের পর বছর কারাবাসের পর আইনি ফাঁক গলে জামিনে মুক্ত হয়ে গেছেন। জামিনে বের হওয়ার পরপরই এই অপরাধীদের অনেকে পুনরায় আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠন, চাঁদাবাজি এবং এলাকাভিত্তিক নতুন সাম্রাজ্য তৈরিতে মেতে উঠেছে।

যেমন, মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল প্রায় দুই যুগ পর জামিনে বের হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় পুনরায় মামলার আসামি হয়েছেন। এমনকি, রামপুরার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় রাজধানীর প্রকাশ্য রাস্তায় আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। এই ঘটনাগুলো অপরাধ বিজ্ঞানের 'লেবেলিং থিওরি' (Labeling Theory) ও কারাব্যবস্থার সংশোধনী ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। কারাগার অপরাধীদের সংশোধন করতে পারছে না, বরং তা আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ক্রিমিনাল নেটওয়ার্কিং হাব'-এ পরিণত হচ্ছে; যার ফলশ্রুতিতে আসামিদের এই ঢালাও মুক্তি সমাজে অপরাধের নতুন হিংস্র চক্র (Recidivism) তৈরি করছে।

একই চিত্র দেখা যায় মাদক সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, গুরুতর সব মাদক মামলার আসামিদের উচ্চ আদালত থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় জামিন পাওয়ার ঘটনায় স্বয়ং দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।

চতুর আইনজীবীদের আইনি ফাঁদ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল এভিডেন্সের অভাব, ফরেনসিক রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতা মামলার প্রাথমিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এই অপরাধীরা সমাজে নিজস্ব সমান্তরাল নিয়ম ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে, যা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুরখেইমের ভাষায় সমাজকে "অ্যানোমি" (Anomie) বা নিয়মহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির দায় আসলে কার? পুলিশকে কেবল ‘কলুর বলদ’ বানিয়ে, সমস্ত দায় তাদের ওপর চাপিয়ে, আইনজীবীদের চতুর যুক্তির ফাঁদে পড়ে মান্যবর বিচারকগণ কি কেবলই জামিন দিয়ে যাবেন?

দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন ৪০ লক্ষাধিক মামলার জটলার কারণে হয়তো বিচারকদের প্রতিটি ফাইলের গভীরে যাওয়ার সময় সংকুচিত, কিন্তু তাই বলে জননিরাপত্তা কি উপেক্ষিত থাকবে?

বিচারকদের তাদের ‘প্রোগ্রেটিভ’ বা বিশেষ বিচারিক ক্ষমতা (Judicial Activism) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল ও দূরদর্শী হওয়া জরুরি। আসামির জামিন পাওয়ার আইনি অধিকারের চেয়ে সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা যে বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ, জামিন আদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তা গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।

এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকে আইনের ফাঁকফোকরের অপব্যবহার রোধে অবিলম্বে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন (Risk Assessment Report): অপরাধীদের জামিন দেওয়ার পূর্বে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।

আইনজীবীদের জবাবদিহিতা: বার কাউন্সিলের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়, যেন বিপুল অর্থের মোহে অন্ধ হয়ে তারা জঘন্য অপরাধীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল হিসেবে কাজ না করেন।

তদন্ত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণাদি দ্রুত সংগ্রহের জন্য পুলিশের তদন্ত সংস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করতে হবে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা: বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ চক্রের (Organized Crime) হাত থেকে মুক্তি অসম্ভব।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি (Social Contract) টিকিয়ে রাখতে হলে এই ধ্বংসাত্মক 'সাপ-লুডু' খেলা রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হয়ে এখনই বন্ধ করতে হবে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিচারহীনতার আবর্ত ও ‘সাপ-লুডু’ খেলা: কার দায়

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, দুর্ধর্ষ অপরাধীর গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী সময়ে আদালতের আইনি মারপ্যাঁচে তার অনায়াস মুক্তি—বাংলাদেশের অপরাধচিত্র ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় এটি যেন এক অন্তহীন ‘সাপ-লুডু’ খেলা। 

এই প্রাতিষ্ঠানিক খেলায় পুলিশ যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে ওপরে ওঠে, তখন আইনের ফাঁকফোকরের সাপটি অপরাধীকে গিলে ফেলে আবার পূর্বের অবস্থানে নামিয়ে আনে।

দাগি আসামি, খুনি, চরম দুর্নীতিবাজ কিংবা মাদকসম্রাটদের আইনের আওতায় আনা যেকোনো সুসভ্য সমাজের জন্যই কঠিনতম কাজ। গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সর্বোচ্চ ব্যবহার আর দিনরাত এক করে পুলিশ বা যৌথবাহিনী যখন এদের খাঁচায় বন্দি করে, তখন চারদিকে বাহবা রব ওঠে, প্রশংসায় ভাসতে থাকেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা 'শাস্তির নিশ্চয়তা' (Certainty of Punishment) বলি, তার অনুপস্থিতির কারণে এই স্বস্তির আয়ুষ্কাল বড্ড সংক্ষিপ্ত হয়।

গ্রেপ্তারের পরপরই দৃশ্যপটে হাজির হয় আদালত পাড়ার এক ভিন্ন সামাজিক ও আইনি বাস্তবতা। ঝানু অপরাধ আইনজীবীরা আইনি সুরক্ষার ঢাল ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে মাঠে নামেন। আইনের চুলচেরা विश्लेषण আর টেকনিক্যাল মারপ্যাঁচে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সফল অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তারা অপরাধীকে মুক্ত করে আনেন।

জামিনে বেরিয়ে এই জঘন্য অপরাধীরা যখন আবার সদর্পে তাদের পুরনো অন্ধকার সাম্রাজ্যে ফিরে যায়, তখন ভেঙে পড়ে দেশপ্রেমিক সৎ পুলিশ অফিসারদের পেশাগত মনোবল। অপরাধ বিজ্ঞানের 'ডিটারেন্স থিওরি' (Deterrence Theory) বা প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব অনুযায়ী, শাস্তির ভয় যখন মন থেকে উঠে যায়, তখন অপরাধ প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য অপরাধীদের সাথে হাত মেলায়। ফলে অনৈতিকতার এক বৃত্তাকার আবর্তে সমাজ সেই তিমিরেই থেকে যায়। সচেতন নাগরিকেরা কেবল নির্বাক দর্শক হয়ে হতাশা প্রকাশ করেন, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কাছে তাদের কিছুই করার থাকে না।

গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক কিছু ভয়াবহ চিত্র এই ‘সাপ-লুডু’ খেলার নির্মম সত্য ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে (Culture of Impunity) প্রমাণ করে। প্রথম আলো ও বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সাম্প্রতিক political পটপরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলার রূপান্তরের সুযোগ নিয়ে কয়েক শত দুর্ধর্ষ অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারামুক্ত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম এবং মিরপুরের আতঙ্ক কিলার আব্বাস বছরের পর বছর কারাবাসের পর আইনি ফাঁক গলে জামিনে মুক্ত হয়ে গেছেন। জামিনে বের হওয়ার পরপরই এই অপরাধীদের অনেকে পুনরায় আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠন, চাঁদাবাজি এবং এলাকাভিত্তিক নতুন সাম্রাজ্য তৈরিতে মেতে উঠেছে।

যেমন, মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল প্রায় দুই যুগ পর জামিনে বের হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় পুনরায় মামলার আসামি হয়েছেন। এমনকি, রামপুরার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় রাজধানীর প্রকাশ্য রাস্তায় আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। এই ঘটনাগুলো অপরাধ বিজ্ঞানের 'লেবেলিং থিওরি' (Labeling Theory) ও কারাব্যবস্থার সংশোধনী ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। কারাগার অপরাধীদের সংশোধন করতে পারছে না, বরং তা আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ক্রিমিনাল নেটওয়ার্কিং হাব'-এ পরিণত হচ্ছে; যার ফলশ্রুতিতে আসামিদের এই ঢালাও মুক্তি সমাজে অপরাধের নতুন হিংস্র চক্র (Recidivism) তৈরি করছে।

একই চিত্র দেখা যায় মাদক সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, গুরুতর সব মাদক মামলার আসামিদের উচ্চ আদালত থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় জামিন পাওয়ার ঘটনায় স্বয়ং দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।

চতুর আইনজীবীদের আইনি ফাঁদ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল এভিডেন্সের অভাব, ফরেনসিক রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতা মামলার প্রাথমিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এই অপরাধীরা সমাজে নিজস্ব সমান্তরাল নিয়ম ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে, যা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুরখেইমের ভাষায় সমাজকে "অ্যানোমি" (Anomie) বা নিয়মহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির দায় আসলে কার? পুলিশকে কেবল ‘কলুর বলদ’ বানিয়ে, সমস্ত দায় তাদের ওপর চাপিয়ে, আইনজীবীদের চতুর যুক্তির ফাঁদে পড়ে মান্যবর বিচারকগণ কি কেবলই জামিন দিয়ে যাবেন?

দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন ৪০ লক্ষাধিক মামলার জটলার কারণে হয়তো বিচারকদের প্রতিটি ফাইলের গভীরে যাওয়ার সময় সংকুচিত, কিন্তু তাই বলে জননিরাপত্তা কি উপেক্ষিত থাকবে?

বিচারকদের তাদের ‘প্রোগ্রেটিভ’ বা বিশেষ বিচারিক ক্ষমতা (Judicial Activism) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল ও দূরদর্শী হওয়া জরুরি। আসামির জামিন পাওয়ার আইনি অধিকারের চেয়ে সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা যে বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ, জামিন আদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তা গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।

এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকে আইনের ফাঁকফোকরের অপব্যবহার রোধে অবিলম্বে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন (Risk Assessment Report): অপরাধীদের জামিন দেওয়ার পূর্বে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।

আইনজীবীদের জবাবদিহিতা: বার কাউন্সিলের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়, যেন বিপুল অর্থের মোহে অন্ধ হয়ে তারা জঘন্য অপরাধীদের প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল হিসেবে কাজ না করেন।

তদন্ত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণাদি দ্রুত সংগ্রহের জন্য পুলিশের তদন্ত সংস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করতে হবে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা: বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ চক্রের (Organized Crime) হাত থেকে মুক্তি অসম্ভব।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি (Social Contract) টিকিয়ে রাখতে হলে এই ধ্বংসাত্মক 'সাপ-লুডু' খেলা রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হয়ে এখনই বন্ধ করতে হবে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত