একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির ব্যাকরণ আমূল বদলে গেছে। সমকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ভূ-অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি এখন আর পৃথক সত্ত্বা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। বর্তমানে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত সমীকরণে বঙ্গোপসাগরীয় অববাহিকাটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রধান কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এই বহুমাত্রিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত বাংলাদেশ।
২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (BMCEC) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের অনীহার কারণে স্থবির হয়ে থাকা ‘বিসিআইএম’ করিডোরের বিকল্প হিসেবে চীন এই ত্রিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্ককে তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখছে।
চীনের জন্য এই করিডোরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে মুক্তি। সমুদ্রপথে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে সংযোগ স্থাপনই বেইজিংয়ের লক্ষ্য।
এলডিসি (LDC) উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য এই করিডোর একটি বিশাল সুযোগ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের ‘কানেক্টিভিটি হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এটি তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে এবং বন্দরগুলোর বাণিজ্যিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন। রাখাইনের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে চীনের মধ্যস্থতা অত্যন্ত জরুরি। নিবন্ধের মূল কথা হলো—রাখাইনে স্থায়ী শান্তি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ পুনর্বাসন ব্যতিরেকে চীনের মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা টেকসই হবে না। তাই, বাংলাদেশ সরকারকে এই করিডোরের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে শর্তযুক্ত করার কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
ত্রিপক্ষীয় এই করিডোর যেমন অপার সম্ভাবনার, তেমনি ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকিও বিদ্যমান। ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির বিপরীতে বাংলাদেশকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা করে চলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই হবে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল ভিত্তি।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ বঙ্গোপসাগর, ভূ-রাজনীতি, বিএমসিইসি, বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ভূ-অর্থনীতি, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, কানেক্টিভিটি, পররাষ্ট্রনীতি, তারেক রহমান, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল। Bay of Bengal, Geopolitics, BMCEC, Bangladesh, China, Myanmar, Rohingya Repatriation, Geo-economics, Belt and Road Initiative, Connectivity, Foreign Policy, Tarique Rahman, Bay of Bengal Region.

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির ব্যাকরণ আমূল বদলে গেছে। সমকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ভূ-অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি এখন আর পৃথক সত্ত্বা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। বর্তমানে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত সমীকরণে বঙ্গোপসাগরীয় অববাহিকাটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রধান কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এই বহুমাত্রিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত বাংলাদেশ।
২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (BMCEC) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের অনীহার কারণে স্থবির হয়ে থাকা ‘বিসিআইএম’ করিডোরের বিকল্প হিসেবে চীন এই ত্রিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্ককে তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখছে।
চীনের জন্য এই করিডোরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে মুক্তি। সমুদ্রপথে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে সংযোগ স্থাপনই বেইজিংয়ের লক্ষ্য।
এলডিসি (LDC) উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য এই করিডোর একটি বিশাল সুযোগ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের ‘কানেক্টিভিটি হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এটি তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে এবং বন্দরগুলোর বাণিজ্যিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন। রাখাইনের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে চীনের মধ্যস্থতা অত্যন্ত জরুরি। নিবন্ধের মূল কথা হলো—রাখাইনে স্থায়ী শান্তি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ পুনর্বাসন ব্যতিরেকে চীনের মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা টেকসই হবে না। তাই, বাংলাদেশ সরকারকে এই করিডোরের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে শর্তযুক্ত করার কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
ত্রিপক্ষীয় এই করিডোর যেমন অপার সম্ভাবনার, তেমনি ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকিও বিদ্যমান। ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির বিপরীতে বাংলাদেশকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা করে চলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই হবে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল ভিত্তি।

আপনার মতামত লিখুন