একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের যৌথ মনস্তত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠা কেবল অতীতের কোনো ঘটনার নির্মোহ মূল্যায়ন নয়; বরং তা বর্তমানের political consciousness ও ভবিষ্যতের জাতীয় চেতনা গঠনের প্রধান নিয়ামক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ঘোষক ও বীর উত্তম খেতাবধারী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ও ফেরারি আসামি বরখাস্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের আটক হওয়ার ঘটনাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
আইনগত ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই আটক নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনার সমান্তরালে দেশের মূলধারার প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে ইতিহাসের এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘বয়ান-বদল’ বা রি-রাইটিং (Rewriting of History) লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই নতুন আখ্যানের আড়ালে নিহিত রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare), যা প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক সত্যকে অপলাপ করে ইতিহাসের এক বিকৃত রূপ উপস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে। একজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ও ভূ-রাজনীতি গবেষক হিসেবে এই সমকালীন বয়ানের অসঙ্গতি এবং এর নেপথ্য সমীকরণ উন্মোচন করা আমি জাতীয় দায়িত্ব বলে মনে করি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান বয়ান হয়ে উঠেছে— হামলাকারীরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ধরে কক্ষের বাইরে নিয়ে এসে গুলি করে।
এই নতুন আখ্যানটি কেবল সমকালীন বস্তুগত ও ফরেনসিক প্রমাণের আলোকেই অসত্য নয়, বরং একজন আজীবন সম্মুখ সমরের পোড়খাওয়া সামরিক কমান্ডারের মনস্তত্ত্বের সাথেও চরমভাবে সংঘর্ষিক।
ইতিহাসের সত্য রক্ষায় আমাদের সমকালীন তদন্ত আদালতের (Court of Inquiry) নথিপত্র, प्रत्यक्षদর্শীদের সাক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত অ্যাকাডেমিক উৎসসমূহের দিকে তাকাতে হবে। মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের 'বাংলাদেশ: সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সংকট', লেঃ কর্নেল (অবঃ) এম এ হামিদের 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' এবং প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'Bangladesh: A Legacy of Blood' গ্রন্থে সেই কালরাত্রির প্রকৃত বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে।
প্রকৃত ঐতিহাসিক দলিল সাক্ষ্য দেয়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে যখন সার্কিট হাউসে অতর্কিত হামলা চালানো হয়, তখন তীব্র গোলাগুলির শব্দে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। একজন আজীবন বীর সৈনিকের সহজাত মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি কোণঠাসা হয়ে লুকিয়ে থাকার বা আত্মসমর্পণ করার নীতি গ্রহণ করেননি।
তিনি নিজেই সাহসিকতার সাথে কক্ষের দরজা খুলে দৃঢ় পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। সেখানে ঘাতকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শক্ত কণ্ঠে, প্রগাঢ় সামরিক স্টাইলে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন:
"What do you want?" (তোমরা কী চাও?)।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তাঁর বিখ্যাত 'অন ভায়োলেন্স' (On Violence) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একজন প্রকৃত নেতার নৈতিক কর্তৃত্ব (Moral Authority) ও ক্যারিশমা তার নির্ভীক উপস্থিতির মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। জিয়াউর রহমান খুনিদের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে সেই বীরোচিত রাষ্ট্রনায়কোচিত চরিত্রের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
গণমাধ্যমের বর্তমান ‘দরজা ভেঙে টেনে বের করার’ নব্য বয়ানটি মূলত তাঁর এই নির্ভীক ও বীরোচিত ভাবমূর্তিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে খর্ব করে জনমানসে তাকে একজন ‘অসহায় ও ভীত’ ব্যক্তি হিসেবে পুনর্নির্মাণের একটি সূক্ষ্ম অপকৌশল।
বর্তমান মিডিয়া ট্রায়ালে আটককৃত মোজাফফরকে যেভাবে মূল চরিত্র বা মূল হত্যাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করার হিড়িক পড়েছে, তাও প্রতিষ্ঠিত তদন্ত নথির পরিপন্থী। ঘটনার পর গঠিত সামরিক ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর প্রথম গুলিবর্ষণকারী ছিলেন চট্টগ্রাম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর-এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান (কর্নেল মতি)। মতির স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশফায়ারের আঘাতেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘটনাস্থলে শাহাদাত বরণ করেন।
মোজাফফর সেখানে আক্রমণকারী ও ঘাতক দলের অন্যতম সহযোগী সদস্য ছিলেন মাত্র, মূল গুলিবর্ষণকারী নন।
এর পাশাপাশি সমকালীন সংবাদমাধ্যমগুলোর আরেকটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পদস্খলন হলো মোজাফফরকে ‘অবসরপ্রাপ্ত মেজর’ (Retired Major) হিসেবে সম্বোধন করা। সামরিক আইন ও বিধিমালা (Army Act) অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্যতম অপরাধে যুক্ত থাকা এবং দীর্ঘকাল পলাতক থাকা কোনো ব্যক্তি কখনো ‘সম্মানজনক অবসর’ বা পেনশনের অধিকারী হতে পারেন না।
১৯৮১ সালের ওই কলঙ্কজনক ঘটনার পর সামরিক আদালতের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক আদেশে তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরাসরি ‘বরখাস্ত’ (Dismissed/Cashiered) করা হয়েছিল। তাকে 'অবসরপ্রাপ্ত' বলা কেবল সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের লঙ্ঘনই নয়, বরং তার অপরাধের ভয়াবহতাকে এক প্রকার লঘু করে দেখানোর শামিল।
জাতীয় ইতিহাসের এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে যখন সুদূরপ্রসারী আখ্যান-বদল চলছে, তখন দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং তৎসংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবী সমাজের এক প্রকার রহস্যজনক নীরবতা গভীর ভাবনার উদ্রেক করে। ফরাসি দার্শনিক জুলিয়েন বেন্দা (Julien Benda)-র বিখ্যাত 'The Treason of the Intellectuals' (বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন কোনো সমাজের বুদ্ধিজীবীরা কিংবা প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনরা প্রাতিষ্ঠানিক সত্য রক্ষার চেয়ে সাময়িক কৌশলগত অবস্থান বা নীরবতাকে শ্রেয় মনে করেন, তখন ইতিহাসের মারাত্মক অপলাপ ঘটে। এই সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা প্রকারান্তরে অপশক্তিকে ইতিহাসের নিজস্ব সুবিধাবাদী বয়ান (Narrative) চাপিয়ে দেওয়ার এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর হঠাৎ মোজাফফরের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়া এবং তাকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটির নেপথ্যে কোনো গভীরতর ভূ-রাজনীতি বা অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা চাল (Intelligence Ploy) থাকা অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। অপরাধবিজ্ঞান এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরিভাষায় একে ‘কৌশলগত তথ্য অবমুক্তকরণ’ (Strategic Information Leakage) বলা যেতে পারে।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে বা যারা দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পর এই খুনির নিখুঁত অবস্থান রাষ্ট্রযন্ত্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রকাশ করেছে, তাদের উদ্দেশ্য কেবল একটি অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়া নাও হতে পারে।
এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের বিনিময়ে তারা বর্তমান সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ বা বিশ্বস্ত পাত্রে পরিণত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নিতে পারে। পরবর্তীতে এই অর্জিত বিশ্বস্ততা ও প্রভাবকে পুঁজি করে তারা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রবেশ করে রাষ্ট্রকে ভুল পথে পরিচালিত করার বা সুদূরপ্রসারী কোনো ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সুযোগ নিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
অতএব, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থেই এই তথ্য সরবরাহকারী চক্রের প্রকৃত মোটিভ (Motivations), তাদের অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর সরকারের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিবিড়, নিরবিচ্ছিন্ন এবং ত্রিমাত্রিক নজরদারি (Deep and Continuous Surveillance) বজায় রাখা অপরিহার্য।
ইতিহাস কোনো নমনীয় কাদার তাল নয় যে কেউ চাইলেই নিজের সাময়িক ক্ষমতার স্বার্থে বা নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে তার রূপ বদলে ফেলবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনের শেষ মুহূর্তের সাহসিকতা ও বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কোনো সমকালীন রাজনৈতিক বয়ান বা সংবাদমাধ্যমের অসতর্ক উপস্থাপন যেন সেই ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক সত্যকে ধূলিসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সচেতন নাগরিকদের সজাগ থাকতে হবে। খুনি মোজাফফরের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রকৃত সত্য সংরক্ষণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের যৌথ মনস্তত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠা কেবল অতীতের কোনো ঘটনার নির্মোহ মূল্যায়ন নয়; বরং তা বর্তমানের political consciousness ও ভবিষ্যতের জাতীয় চেতনা গঠনের প্রধান নিয়ামক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ঘোষক ও বীর উত্তম খেতাবধারী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ও ফেরারি আসামি বরখাস্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের আটক হওয়ার ঘটনাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
আইনগত ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই আটক নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনার সমান্তরালে দেশের মূলধারার প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে ইতিহাসের এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘বয়ান-বদল’ বা রি-রাইটিং (Rewriting of History) লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই নতুন আখ্যানের আড়ালে নিহিত রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare), যা প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক সত্যকে অপলাপ করে ইতিহাসের এক বিকৃত রূপ উপস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে। একজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ও ভূ-রাজনীতি গবেষক হিসেবে এই সমকালীন বয়ানের অসঙ্গতি এবং এর নেপথ্য সমীকরণ উন্মোচন করা আমি জাতীয় দায়িত্ব বলে মনে করি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান বয়ান হয়ে উঠেছে— হামলাকারীরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ধরে কক্ষের বাইরে নিয়ে এসে গুলি করে।
এই নতুন আখ্যানটি কেবল সমকালীন বস্তুগত ও ফরেনসিক প্রমাণের আলোকেই অসত্য নয়, বরং একজন আজীবন সম্মুখ সমরের পোড়খাওয়া সামরিক কমান্ডারের মনস্তত্ত্বের সাথেও চরমভাবে সংঘর্ষিক।
ইতিহাসের সত্য রক্ষায় আমাদের সমকালীন তদন্ত আদালতের (Court of Inquiry) নথিপত্র, प्रत्यक्षদর্শীদের সাক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত অ্যাকাডেমিক উৎসসমূহের দিকে তাকাতে হবে। মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের 'বাংলাদেশ: সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সংকট', লেঃ কর্নেল (অবঃ) এম এ হামিদের 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' এবং প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'Bangladesh: A Legacy of Blood' গ্রন্থে সেই কালরাত্রির প্রকৃত বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে।
প্রকৃত ঐতিহাসিক দলিল সাক্ষ্য দেয়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে যখন সার্কিট হাউসে অতর্কিত হামলা চালানো হয়, তখন তীব্র গোলাগুলির শব্দে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। একজন আজীবন বীর সৈনিকের সহজাত মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি কোণঠাসা হয়ে লুকিয়ে থাকার বা আত্মসমর্পণ করার নীতি গ্রহণ করেননি।
তিনি নিজেই সাহসিকতার সাথে কক্ষের দরজা খুলে দৃঢ় পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। সেখানে ঘাতকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শক্ত কণ্ঠে, প্রগাঢ় সামরিক স্টাইলে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন:
"What do you want?" (তোমরা কী চাও?)।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তাঁর বিখ্যাত 'অন ভায়োলেন্স' (On Violence) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একজন প্রকৃত নেতার নৈতিক কর্তৃত্ব (Moral Authority) ও ক্যারিশমা তার নির্ভীক উপস্থিতির মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। জিয়াউর রহমান খুনিদের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে সেই বীরোচিত রাষ্ট্রনায়কোচিত চরিত্রের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
গণমাধ্যমের বর্তমান ‘দরজা ভেঙে টেনে বের করার’ নব্য বয়ানটি মূলত তাঁর এই নির্ভীক ও বীরোচিত ভাবমূর্তিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে খর্ব করে জনমানসে তাকে একজন ‘অসহায় ও ভীত’ ব্যক্তি হিসেবে পুনর্নির্মাণের একটি সূক্ষ্ম অপকৌশল।
বর্তমান মিডিয়া ট্রায়ালে আটককৃত মোজাফফরকে যেভাবে মূল চরিত্র বা মূল হত্যাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করার হিড়িক পড়েছে, তাও প্রতিষ্ঠিত তদন্ত নথির পরিপন্থী। ঘটনার পর গঠিত সামরিক ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর প্রথম গুলিবর্ষণকারী ছিলেন চট্টগ্রাম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর-এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান (কর্নেল মতি)। মতির স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশফায়ারের আঘাতেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘটনাস্থলে শাহাদাত বরণ করেন।
মোজাফফর সেখানে আক্রমণকারী ও ঘাতক দলের অন্যতম সহযোগী সদস্য ছিলেন মাত্র, মূল গুলিবর্ষণকারী নন।
এর পাশাপাশি সমকালীন সংবাদমাধ্যমগুলোর আরেকটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পদস্খলন হলো মোজাফফরকে ‘অবসরপ্রাপ্ত মেজর’ (Retired Major) হিসেবে সম্বোধন করা। সামরিক আইন ও বিধিমালা (Army Act) অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্যতম অপরাধে যুক্ত থাকা এবং দীর্ঘকাল পলাতক থাকা কোনো ব্যক্তি কখনো ‘সম্মানজনক অবসর’ বা পেনশনের অধিকারী হতে পারেন না।
১৯৮১ সালের ওই কলঙ্কজনক ঘটনার পর সামরিক আদালতের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক আদেশে তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরাসরি ‘বরখাস্ত’ (Dismissed/Cashiered) করা হয়েছিল। তাকে 'অবসরপ্রাপ্ত' বলা কেবল সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের লঙ্ঘনই নয়, বরং তার অপরাধের ভয়াবহতাকে এক প্রকার লঘু করে দেখানোর শামিল।
জাতীয় ইতিহাসের এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে যখন সুদূরপ্রসারী আখ্যান-বদল চলছে, তখন দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং তৎসংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবী সমাজের এক প্রকার রহস্যজনক নীরবতা গভীর ভাবনার উদ্রেক করে। ফরাসি দার্শনিক জুলিয়েন বেন্দা (Julien Benda)-র বিখ্যাত 'The Treason of the Intellectuals' (বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন কোনো সমাজের বুদ্ধিজীবীরা কিংবা প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনরা প্রাতিষ্ঠানিক সত্য রক্ষার চেয়ে সাময়িক কৌশলগত অবস্থান বা নীরবতাকে শ্রেয় মনে করেন, তখন ইতিহাসের মারাত্মক অপলাপ ঘটে। এই সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা প্রকারান্তরে অপশক্তিকে ইতিহাসের নিজস্ব সুবিধাবাদী বয়ান (Narrative) চাপিয়ে দেওয়ার এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর হঠাৎ মোজাফফরের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়া এবং তাকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটির নেপথ্যে কোনো গভীরতর ভূ-রাজনীতি বা অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা চাল (Intelligence Ploy) থাকা অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। অপরাধবিজ্ঞান এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরিভাষায় একে ‘কৌশলগত তথ্য অবমুক্তকরণ’ (Strategic Information Leakage) বলা যেতে পারে।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে বা যারা দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পর এই খুনির নিখুঁত অবস্থান রাষ্ট্রযন্ত্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রকাশ করেছে, তাদের উদ্দেশ্য কেবল একটি অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়া নাও হতে পারে।
এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের বিনিময়ে তারা বর্তমান সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ বা বিশ্বস্ত পাত্রে পরিণত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নিতে পারে। পরবর্তীতে এই অর্জিত বিশ্বস্ততা ও প্রভাবকে পুঁজি করে তারা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রবেশ করে রাষ্ট্রকে ভুল পথে পরিচালিত করার বা সুদূরপ্রসারী কোনো ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সুযোগ নিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
অতএব, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থেই এই তথ্য সরবরাহকারী চক্রের প্রকৃত মোটিভ (Motivations), তাদের অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর সরকারের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিবিড়, নিরবিচ্ছিন্ন এবং ত্রিমাত্রিক নজরদারি (Deep and Continuous Surveillance) বজায় রাখা অপরিহার্য।
ইতিহাস কোনো নমনীয় কাদার তাল নয় যে কেউ চাইলেই নিজের সাময়িক ক্ষমতার স্বার্থে বা নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে তার রূপ বদলে ফেলবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনের শেষ মুহূর্তের সাহসিকতা ও বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কোনো সমকালীন রাজনৈতিক বয়ান বা সংবাদমাধ্যমের অসতর্ক উপস্থাপন যেন সেই ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক সত্যকে ধূলিসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সচেতন নাগরিকদের সজাগ থাকতে হবে। খুনি মোজাফফরের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রকৃত সত্য সংরক্ষণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

আপনার মতামত লিখুন