‘দুটি পাতার একটি কুঁড়ি’—এই কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ঘেরা সবুজ চা বাগান, আঁকাবাঁকা টিলা আর প্রকৃতির মোহনীয় সৌন্দর্য। প্রতিদিন সকালে কিংবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এক কাপ চা আমাদের ক্লান্তি দূর করে, এনে দেয় প্রশান্তি। কিন্তু সেই চায়ের কাপে সুখ মেশানো মানুষের জীবন কতটা বিষাদে ভরা—তা খুব কম মানুষই ভেবে দেখেন।
আজ ২১ মে, জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিশ্বজুড়ে চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে পৃথিবী বদলালেও, দেশের চা শ্রমিকদের জীবন যেন এখনও আটকে আছে সাদাকালো এক বাস্তবতায়। বংশপরম্পরায় কাজ করে যাওয়া এই শ্রমিকদের আক্ষেপ—চায়ের গাছ যেভাবে ২৬ ইঞ্চির পর আর বাড়ে না, তাদের জীবনটাও যেন ঠিক তেমনি থমকে আছে।
বর্তমানে দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকা মজুরিতে জীবন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামসহ সারা দেশের চা বাগানের শ্রমিকরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যেখানে দুই কেজি চাল কিনতেও হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই আয়ে ৫-৬ জনের পরিবার চালানো অনেকের কাছেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকার বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের এই দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
"সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করি। দিন শেষে পাই ১৭৮ টাকা। কাজ না করলে সেই টাকাও মেলে না। এই টাকায় এখন কীভাবে সংসার চলবে?"
হনুফা বেগম (৯ নম্বর সেক্টর, নেপচুন চা বাগান): "ছোট ভাঙাচোরা ঘরে গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে থাকতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ ঘর মেরামতের কথা বললেও বছরের পর বছর তা হয় না। কাজ হারালে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকবে না।"
কৃষ্ণ মনি (কর্ণফুলী চা বাগান): "সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা কাজ করি, দুপুরে খেতে যাওয়ারও সময় পাই না। গরিব বলেই এই অল্প টাকায় কাজ করতে হচ্ছে।"
অঞ্জনি ত্রিপুরা (বৈলগাঁও চা বাগান): "সামনে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম, কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ এখনও একটি রেইনকোটও দেয়নি। শুধু একটা পাতলা প্লাস্টিক দেয়, তাতেই শরীর ভিজে যায়।"
শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগানে শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় না। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা নারী ও শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তাও চরমভাবে উপেক্ষিত। এমনকি প্রচলিত শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
"চা শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে। কিন্তু তাদের জীবনে বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি চোখে পড়ে না।" — মৃদুল কর্মকার, চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা
আঠারো শতকে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে চায়ের ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) চায়ের টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর দিলেও মাঠপর্যায়ের শ্রমিকরা রয়ে গেছেন আধুনিকতার আলোর বাইরে, এক অন্ধকার জনপদে।
সবুজ চা বাগানের মোহনীয় সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও অনিশ্চয়তার গল্প। আন্তর্জাতিক চা দিবসে চায়ের ঐতিহ্য উদযাপনের পাশাপাশি এই বঞ্চিত মানুষগুলোর মানবিক জীবন, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
‘দুটি পাতার একটি কুঁড়ি’—এই কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ঘেরা সবুজ চা বাগান, আঁকাবাঁকা টিলা আর প্রকৃতির মোহনীয় সৌন্দর্য। প্রতিদিন সকালে কিংবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এক কাপ চা আমাদের ক্লান্তি দূর করে, এনে দেয় প্রশান্তি। কিন্তু সেই চায়ের কাপে সুখ মেশানো মানুষের জীবন কতটা বিষাদে ভরা—তা খুব কম মানুষই ভেবে দেখেন।
আজ ২১ মে, জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিশ্বজুড়ে চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে পৃথিবী বদলালেও, দেশের চা শ্রমিকদের জীবন যেন এখনও আটকে আছে সাদাকালো এক বাস্তবতায়। বংশপরম্পরায় কাজ করে যাওয়া এই শ্রমিকদের আক্ষেপ—চায়ের গাছ যেভাবে ২৬ ইঞ্চির পর আর বাড়ে না, তাদের জীবনটাও যেন ঠিক তেমনি থমকে আছে।
বর্তমানে দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকা মজুরিতে জীবন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামসহ সারা দেশের চা বাগানের শ্রমিকরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যেখানে দুই কেজি চাল কিনতেও হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই আয়ে ৫-৬ জনের পরিবার চালানো অনেকের কাছেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকার বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের এই দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
"সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করি। দিন শেষে পাই ১৭৮ টাকা। কাজ না করলে সেই টাকাও মেলে না। এই টাকায় এখন কীভাবে সংসার চলবে?"
হনুফা বেগম (৯ নম্বর সেক্টর, নেপচুন চা বাগান): "ছোট ভাঙাচোরা ঘরে গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে থাকতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ ঘর মেরামতের কথা বললেও বছরের পর বছর তা হয় না। কাজ হারালে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকবে না।"
কৃষ্ণ মনি (কর্ণফুলী চা বাগান): "সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা কাজ করি, দুপুরে খেতে যাওয়ারও সময় পাই না। গরিব বলেই এই অল্প টাকায় কাজ করতে হচ্ছে।"
অঞ্জনি ত্রিপুরা (বৈলগাঁও চা বাগান): "সামনে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম, কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ এখনও একটি রেইনকোটও দেয়নি। শুধু একটা পাতলা প্লাস্টিক দেয়, তাতেই শরীর ভিজে যায়।"
শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগানে শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় না। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা নারী ও শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তাও চরমভাবে উপেক্ষিত। এমনকি প্রচলিত শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
"চা শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে। কিন্তু তাদের জীবনে বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি চোখে পড়ে না।" — মৃদুল কর্মকার, চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা
আঠারো শতকে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে চায়ের ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) চায়ের টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর দিলেও মাঠপর্যায়ের শ্রমিকরা রয়ে গেছেন আধুনিকতার আলোর বাইরে, এক অন্ধকার জনপদে।
সবুজ চা বাগানের মোহনীয় সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও অনিশ্চয়তার গল্প। আন্তর্জাতিক চা দিবসে চায়ের ঐতিহ্য উদযাপনের পাশাপাশি এই বঞ্চিত মানুষগুলোর মানবিক জীবন, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন