প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজনীতি বিশ্লেষক
ইতিহাসের গতিপথ সবসময় সরলরেখায় অগ্রসর হয় না। জাতির জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে, যখন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত, বিচক্ষণ নেতৃত্ব কিংবা দায়িত্বশীল ভূমিকা একটি দেশকে সংকট থেকে সম্ভাবনার পথে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন একটি অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে জাতি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশ এক জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা শঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই উত্তরণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জ্জামানের নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন মহলে মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার যে অবস্থান দেখা গেছে, তা অনেকের কাছেই ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। রাজনৈতিক সংকটের সময় ক্ষমতা গ্রহণের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে অনেকে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
একটি পেশাদার সামরিক বাহিনীর মূল শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডে সেই পেশাদারিত্বের প্রতিফলন দেখা গেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাহিনীর ভূমিকা জনগণের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
এ সময় আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে—ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি সম্মান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের মতো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরও নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন পালনের অধিকার রয়েছে। এই অধিকারকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার ওপর। অতীতের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা আরও সুসংহত হবে।
আগামী দিনগুলোতে নির্বাচিত সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পেশাদার, আধুনিক ও জনগণের আস্থাভাজন একটি সেনাবাহিনী জাতীয় অগ্রযাত্রার অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ নতুন প্রত্যাশার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ। রাষ্ট্রের সকল অংশীজন নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে একটি বৈষম্যহীন, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হবে।
জাতির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজনীতি বিশ্লেষক
ইতিহাসের গতিপথ সবসময় সরলরেখায় অগ্রসর হয় না। জাতির জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে, যখন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত, বিচক্ষণ নেতৃত্ব কিংবা দায়িত্বশীল ভূমিকা একটি দেশকে সংকট থেকে সম্ভাবনার পথে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন একটি অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে জাতি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশ এক জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা শঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই উত্তরণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জ্জামানের নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন মহলে মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার যে অবস্থান দেখা গেছে, তা অনেকের কাছেই ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। রাজনৈতিক সংকটের সময় ক্ষমতা গ্রহণের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে অনেকে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
একটি পেশাদার সামরিক বাহিনীর মূল শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডে সেই পেশাদারিত্বের প্রতিফলন দেখা গেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাহিনীর ভূমিকা জনগণের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
এ সময় আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে—ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি সম্মান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের মতো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরও নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন পালনের অধিকার রয়েছে। এই অধিকারকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার ওপর। অতীতের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা আরও সুসংহত হবে।
আগামী দিনগুলোতে নির্বাচিত সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পেশাদার, আধুনিক ও জনগণের আস্থাভাজন একটি সেনাবাহিনী জাতীয় অগ্রযাত্রার অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ নতুন প্রত্যাশার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ। রাষ্ট্রের সকল অংশীজন নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে একটি বৈষম্যহীন, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হবে।
জাতির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন