নজর বিডি
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

ত্যাগের মহিমায় ঢাকার পাড়া-মহল্লায় কোরবানি উৎসবের আমেজ

ত্যাগের মহিমায় ঢাকার পাড়া-মহল্লায় কোরবানি উৎসবের আমেজ

সকাল গড়াতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ভরে উঠেছে কোরবানির পশুর ডাক, তাকবিরের ধ্বনি আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণায়। ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা—ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা বুকে ধারণ করে রাজধানীর আদাবর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মিরপুরজুড়ে সকাল থেকেই চলছে কোরবানির উৎসব।

কেউ গরুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে আদর করছেন, কেউ শেষবারের মতো পশুর শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও শিশুদের উচ্ছ্বাস, কোথাও আবার চোখে জল নিয়ে পশুর প্রতি মায়া—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছিল সকাল থেকেই। আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদের নামাজের পরই অলিগলিতে শুরু হয় পশু কোরবানি। বিকেল গড়ালেও বিভিন্ন স্থানে কোরবানি ও মাংস কাটার ব্যস্ততা দেখা গেছে।

সকাল থেকে সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মহল্লায় কোরবানিকে ঘিরে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়েছে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবির, বাসার ছাদ ও গলিতে চলছে প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন।

আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় কয়েকজন তরুণকে দেখা যায় কোরবানির আগে গরুকে পানি খাওয়াতে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন:

“কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ আর হিংসাকে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়।”

আদাবর এলাকায় সকাল থেকেই ছিল মাংস কাটা ও বিতরণের ব্যস্ততা। কেউ আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জনদের জন্য কোরবানির মাংস প্যাকেট করছেন, আবার গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আলাদা অংশ প্রস্তুত রাখছেন। স্থানীয় গৃহিণী আইরিন আক্তার বলেন, “সারা বছর অনেক কষ্টে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও কোরবানির আনন্দ আছে। ঈদের সৌন্দর্য তো সব কিছু ভাগাভাগি করার মধ্যেই।”

শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় কয়েকটি স্থানে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। কোথাও যেন দুর্গন্ধ বা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতনতা চোখে পড়ে। পাশাপাশি কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে সিটি করপোরেশনের কর্মীরাও সক্রিয় রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ঈদে একটি অভিনব উদ্যোগ চোখে পড়েছে। তারা পশুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি দড়ি কিনে বিতরণ করছে, যা প্রথমে পশুর মালা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে বড় ময়লার ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। অনেকেই এই বহুমুখী ব্যাগটি ব্যবহার করছেন।

আদাবরের স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও খানকার শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন:

“কোরবানির মূল কথা তাকওয়া। আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের নিয়ত ও আন্তরিকতা। তাই কোরবানির পাশাপাশি নিজের চরিত্র ও মনকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি। কোরবানি শেষ হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ নয়, কোরবানির বর্জ্য অপসারণও কিন্তু ঈমানের অঙ্গ।”

মিরপুর আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাইদুল হক বলেন, প্রতিবছরই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিড়ম্বনায় থাকতে হয়। তাই এবার সিটি করপোরেশনের চেষ্টার পাশাপাশি তারা নিজেরাও সকাল থেকে টিম গঠন করে এলাকায় বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ করছেন।

মোহাম্মদপুর ও বছিলার বিভিন্ন ব্লক ও আবাসিক এলাকায় দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা কৌতূহল নিয়ে কোরবানির কার্যক্রম দেখছে। অনেক পরিবারই শিশুদের কোরবানির ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতির চিত্রও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক জায়গায় কয়েক পরিবার মিলে ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন এবং তরুণরা স্বেচ্ছায় মাংস কাটা ও বিতরণের কাজে অংশ নিচ্ছেন।

আদাবরে ভাগে কোরবানি দেওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুজ্জামান আহমেদ বলেন, “ঈদ আমাদের ত্যাগ শেখায়। সামর্থ্যের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টির চিন্তা থেকে ভাগে কোরবানি দিচ্ছি। সকালে মেয়েকে নিয়ে কোরবানির পশু দেখিয়েছি এবং মাংস বিতরণেও ওকে সঙ্গে রাখছি। যাতে সে ইসলামের এই বেসিক ইবাদত সম্পর্কে আগ্রহী হয়। কন্যা জানুক, পশু কোরবানি করলেই হবে না, মনের পশুকেও কোরবানি করতে হয় ত্যাগের মাধ্যমে।”

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ ঈদুল আজহা, ঢাকা কোরবানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সম্প্রীতি, ঢাকা সংবাদ, ধর্মীয় উৎসব, Eid ul Adha, Dhaka Qurbani, Waste Management, Social Harmony, Dhaka News, Religious Festival

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


ত্যাগের মহিমায় ঢাকার পাড়া-মহল্লায় কোরবানি উৎসবের আমেজ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

সকাল গড়াতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ভরে উঠেছে কোরবানির পশুর ডাক, তাকবিরের ধ্বনি আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণায়। ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা—ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা বুকে ধারণ করে রাজধানীর আদাবর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মিরপুরজুড়ে সকাল থেকেই চলছে কোরবানির উৎসব।

কেউ গরুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে আদর করছেন, কেউ শেষবারের মতো পশুর শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও শিশুদের উচ্ছ্বাস, কোথাও আবার চোখে জল নিয়ে পশুর প্রতি মায়া—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছিল সকাল থেকেই। আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদের নামাজের পরই অলিগলিতে শুরু হয় পশু কোরবানি। বিকেল গড়ালেও বিভিন্ন স্থানে কোরবানি ও মাংস কাটার ব্যস্ততা দেখা গেছে।

সকাল থেকে সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মহল্লায় কোরবানিকে ঘিরে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়েছে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবির, বাসার ছাদ ও গলিতে চলছে প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন।

আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় কয়েকজন তরুণকে দেখা যায় কোরবানির আগে গরুকে পানি খাওয়াতে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন:

“কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ আর হিংসাকে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়।”

আদাবর এলাকায় সকাল থেকেই ছিল মাংস কাটা ও বিতরণের ব্যস্ততা। কেউ আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জনদের জন্য কোরবানির মাংস প্যাকেট করছেন, আবার গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আলাদা অংশ প্রস্তুত রাখছেন। স্থানীয় গৃহিণী আইরিন আক্তার বলেন, “সারা বছর অনেক কষ্টে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও কোরবানির আনন্দ আছে। ঈদের সৌন্দর্য তো সব কিছু ভাগাভাগি করার মধ্যেই।”

শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় কয়েকটি স্থানে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। কোথাও যেন দুর্গন্ধ বা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতনতা চোখে পড়ে। পাশাপাশি কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে সিটি করপোরেশনের কর্মীরাও সক্রিয় রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ঈদে একটি অভিনব উদ্যোগ চোখে পড়েছে। তারা পশুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি দড়ি কিনে বিতরণ করছে, যা প্রথমে পশুর মালা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে বড় ময়লার ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। অনেকেই এই বহুমুখী ব্যাগটি ব্যবহার করছেন।

আদাবরের স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও খানকার শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন:

“কোরবানির মূল কথা তাকওয়া। আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের নিয়ত ও আন্তরিকতা। তাই কোরবানির পাশাপাশি নিজের চরিত্র ও মনকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি। কোরবানি শেষ হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ নয়, কোরবানির বর্জ্য অপসারণও কিন্তু ঈমানের অঙ্গ।”

মিরপুর আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাইদুল হক বলেন, প্রতিবছরই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিড়ম্বনায় থাকতে হয়। তাই এবার সিটি করপোরেশনের চেষ্টার পাশাপাশি তারা নিজেরাও সকাল থেকে টিম গঠন করে এলাকায় বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ করছেন।

মোহাম্মদপুর ও বছিলার বিভিন্ন ব্লক ও আবাসিক এলাকায় দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা কৌতূহল নিয়ে কোরবানির কার্যক্রম দেখছে। অনেক পরিবারই শিশুদের কোরবানির ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতির চিত্রও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক জায়গায় কয়েক পরিবার মিলে ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন এবং তরুণরা স্বেচ্ছায় মাংস কাটা ও বিতরণের কাজে অংশ নিচ্ছেন।

আদাবরে ভাগে কোরবানি দেওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুজ্জামান আহমেদ বলেন, “ঈদ আমাদের ত্যাগ শেখায়। সামর্থ্যের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টির চিন্তা থেকে ভাগে কোরবানি দিচ্ছি। সকালে মেয়েকে নিয়ে কোরবানির পশু দেখিয়েছি এবং মাংস বিতরণেও ওকে সঙ্গে রাখছি। যাতে সে ইসলামের এই বেসিক ইবাদত সম্পর্কে আগ্রহী হয়। কন্যা জানুক, পশু কোরবানি করলেই হবে না, মনের পশুকেও কোরবানি করতে হয় ত্যাগের মাধ্যমে।”


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত