নজর বিডি
আপডেট : শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ

চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সকাল থেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি বরিশালের বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের অবহেলিত-এতিম শিশুদের জন্য আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার আশায় তারা দিনভর ছুটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। 

কিন্তু দিন শেষে সেই সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে তাদের পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের রাজগুরু কেরাতুল কোরআন কওমি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ তাঁর ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ঈদের দিন সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় তারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মাদরাসার সহযোগিতায় মোট ২২০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় মূল বিপত্তি।

তিনি বলেন, “কয়েকজন পাইকারকে ফোন দিয়ে অনুরোধ করলেও কেউ চামড়া নিতে সাড়া দেয়নি। বাধ্য হয়ে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রহমতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চামড়াগুলো নিয়ে আমরা সারারাত অপেক্ষা করেছি। কোনো ক্রেতা পাইনি। ফেলে গেলে পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে এবং মানুষের কষ্ট হবে ভেবে সারারাত ওখানেই পাহারায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আজ শুক্রবার (২৯ মে) সকালে গৌরনদীর টকরি বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ট্যানারি মালিকের কাছে অনেকটা জোর করেই চামড়াগুলো গছিয়ে দিতে হয়েছে। তিনি ২২০টি চামড়ার জন্য মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন। এতে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে মাত্র ৬৮ থেকে ৭০ টাকা! এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর থেকে কোনো মাদরাসা আর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহী হবে না।”

শুধু বাবুগঞ্জ নয়; বরিশালের উজিরপুর, মুলাদী ও হিজলা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার চামড়া সংগ্রহকারী মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। চামড়া পরিবহনে যে ভ্যান ভাড়া ও শ্রমিক খরচ হয়েছে, চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বিভিন্ন এলাকায় গরুর চামড়া পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে চামড়া সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে, আবার কোথাও নামমাত্র মূল্য দিয়ে পাইকাররা চামড়া কিনছেন।

চামড়া বিক্রেতা ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো চামড়ার বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। তাদের বেঁধে দেওয়া সিন্ডিকেট মূল্যের বাইরে চামড়া বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং চামড়ানির্ভর ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাজারে কার্যকর সরকারি তদারকি না থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।

বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা তীরবর্তী ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকায়ও ঈদের দিন ও আজ শুক্রবার মাদরাসার শিক্ষক ও প্রতিনিধিদের চামড়া নিয়ে হন্যে হয়ে ক্রেতা খুঁজতে দেখা গেছে। নগরের জামিয়াতুল মাদরাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি ৪২টি বড় গরুর চামড়া কোনোমতে ৪৫০ টাকা করে বিক্রি করতে পেরেছেন। পরে আরও কিছু চামড়া নিয়ে এলে পাইকাররা আগের চেয়েও অর্ধেক দাম প্রস্তাব করেন।

এদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতির এই নাজুক দশার জন্য ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দায়ী করছেন। তাদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের দীর্ঘদিনের বিপুল অঙ্কের পাওনা টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। একই সঙ্গে লবণ, পরিবহন ও শ্রমিকসহ সংরক্ষণ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তারা নিজেরাও বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।

আড়তদাররা জানান, বর্তমানে বাজারে মানভেদে বড় গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৩০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগে এ বছর প্রায় ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে তীব্র গরম এবং স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত বছর বরিশাল জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। চলতি বছর কোরবানির জন্য জেলা জুড়ে ১ লাখ ২৯ হাজার গরুর সরবরাহ ছিল। প্রকৃত কোরবানির সংখ্যা আরও কয়েক দিন পর সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। তবে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হওয়ায় এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ বরিশাল নিউজ, কোরবানির চামড়া, চামড়ার বাজার, চামড়া সিন্ডিকেট, মাদরাসার চামড়া সংগ্রহ, পশুর চামড়া, চামড়ার দাম, বাবুগঞ্জ বরিশাল, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর Barisal News, Qurbani Leather Market, Raw Hide Price, Leather Syndicate, Madrasah Collection, Barisal Hide Market, Livestock Office Barisal, Bangladesh Leather Market

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬

featured Image

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সকাল থেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি বরিশালের বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের অবহেলিত-এতিম শিশুদের জন্য আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার আশায় তারা দিনভর ছুটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। 

কিন্তু দিন শেষে সেই সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে তাদের পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের রাজগুরু কেরাতুল কোরআন কওমি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ তাঁর ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ঈদের দিন সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় তারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মাদরাসার সহযোগিতায় মোট ২২০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় মূল বিপত্তি।

তিনি বলেন, “কয়েকজন পাইকারকে ফোন দিয়ে অনুরোধ করলেও কেউ চামড়া নিতে সাড়া দেয়নি। বাধ্য হয়ে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রহমতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চামড়াগুলো নিয়ে আমরা সারারাত অপেক্ষা করেছি। কোনো ক্রেতা পাইনি। ফেলে গেলে পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে এবং মানুষের কষ্ট হবে ভেবে সারারাত ওখানেই পাহারায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আজ শুক্রবার (২৯ মে) সকালে গৌরনদীর টকরি বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ট্যানারি মালিকের কাছে অনেকটা জোর করেই চামড়াগুলো গছিয়ে দিতে হয়েছে। তিনি ২২০টি চামড়ার জন্য মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন। এতে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে মাত্র ৬৮ থেকে ৭০ টাকা! এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর থেকে কোনো মাদরাসা আর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহী হবে না।”

শুধু বাবুগঞ্জ নয়; বরিশালের উজিরপুর, মুলাদী ও হিজলা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার চামড়া সংগ্রহকারী মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। চামড়া পরিবহনে যে ভ্যান ভাড়া ও শ্রমিক খরচ হয়েছে, চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বিভিন্ন এলাকায় গরুর চামড়া পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে চামড়া সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে, আবার কোথাও নামমাত্র মূল্য দিয়ে পাইকাররা চামড়া কিনছেন।

চামড়া বিক্রেতা ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো চামড়ার বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। তাদের বেঁধে দেওয়া সিন্ডিকেট মূল্যের বাইরে চামড়া বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং চামড়ানির্ভর ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাজারে কার্যকর সরকারি তদারকি না থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।

বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা তীরবর্তী ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকায়ও ঈদের দিন ও আজ শুক্রবার মাদরাসার শিক্ষক ও প্রতিনিধিদের চামড়া নিয়ে হন্যে হয়ে ক্রেতা খুঁজতে দেখা গেছে। নগরের জামিয়াতুল মাদরাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি ৪২টি বড় গরুর চামড়া কোনোমতে ৪৫০ টাকা করে বিক্রি করতে পেরেছেন। পরে আরও কিছু চামড়া নিয়ে এলে পাইকাররা আগের চেয়েও অর্ধেক দাম প্রস্তাব করেন।

এদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতির এই নাজুক দশার জন্য ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দায়ী করছেন। তাদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের দীর্ঘদিনের বিপুল অঙ্কের পাওনা টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। একই সঙ্গে লবণ, পরিবহন ও শ্রমিকসহ সংরক্ষণ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তারা নিজেরাও বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।

আড়তদাররা জানান, বর্তমানে বাজারে মানভেদে বড় গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৩০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগে এ বছর প্রায় ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে তীব্র গরম এবং স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত বছর বরিশাল জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। চলতি বছর কোরবানির জন্য জেলা জুড়ে ১ লাখ ২৯ হাজার গরুর সরবরাহ ছিল। প্রকৃত কোরবানির সংখ্যা আরও কয়েক দিন পর সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। তবে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হওয়ায় এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত