নজর বিডি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬

বিশ্ব কূটনীতির শীর্ষে বাংলাদেশ: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত

বিশ্ব কূটনীতির শীর্ষে বাংলাদেশ: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত

বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে ২ জুন ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের বৈশ্বিক ফোরাম—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বিপুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রার্থী, বহুপাক্ষিক কূটনীতির অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করে বাংলাদেশ এই গৌরবময় আসনটি পুনরুদ্ধার করেছে। ১৯০টি কাস্ট হওয়া ভোটের মধ্যে ড. খলিলুর রহমান পান ৯৯টি ভোট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯১টি ভোট। এই ঐতিহাসিক বিজয় বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, ভূ-রাজনৈতিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতায় আমাদের ইতিবাচক ভূমিকার এক বলিষ্ঠ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

আজ থেকে ঠিক চার দশক আগে, ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ড. খলিলুর রহমানের এই নির্বাচন বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের যোগ্যতার এক নতুন যুগের সূচনা করল। সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন পদ্ধতি, এর মেয়াদ, ভোটের সমীকরণ এবং এর একাডেমিক গুরুত্ব নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UNGA) হলো বিশ্বসংস্থার একমাত্র অঙ্গ যেখানে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সবার সমান প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং প্রত্যেকের একটি করে vote রয়েছে। একে প্রায়শই 'বিশ্বের আইনসভা' বা 'পার্লামেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড' বলা হয়।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি (President of the General Assembly - PGA) এই উচ্চপর্যায়ের পরিষদের অধিবেশনগুলো পরিচালনা করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের আলোচনা ও এজেন্ডা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করেন। যদিও পদটি মূলত তাত্ত্বিকভাবে এবং নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ ও সমন্বয়ধর্মী, তবুও বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন এবং বড় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনে এই পদের কূটনৈতিক ওজন অপরসিম।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি প্রতি বছর বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে আবর্তিত (Rotate) হয়। 

এই অঞ্চলগুলো হলো, আফ্রিকা গ্রুপ, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ, পূর্ব ইউরোপ গ্রুপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় গ্রুপ, পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য গ্রুপ

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হতে যাওয়া ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি নির্ধারিত ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য। সাধারণত এই গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের (Consensus) ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। তবে যখন কোনো গ্রুপ থেকে একাধিক রাষ্ট্র প্রার্থী দেয়, তখন বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভোটে গড়ায়। ৮১তম অধিবেশনের জন্য বাংলাদেশ এবং সাইপ্রাস উভয় দেশই এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে শক্ত প্রার্থী দেওয়ায় এবার সমঝোতার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

জাতিসংঘের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০ নম্বর ধারা (Rule 30 of the Rules of Procedure) অনুযায়ী সাধারণ পরিষদের হলে এই নির্বাচন সরাসরি গোপন ব্যালটের (Secret Ballot) মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। ২ জুন ২০২৬ নিউইয়র্ক সময় সকাল ১০টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৯০টি রাষ্ট্র এই নির্বাচনে ভোট প্রদান করে। কোনো ভোট বাতিল বা অনুপস্থিতি (Abstention) ছিল না। বিজয়ের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৯৬টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ ৯৯টি vote পেয়ে সেই কোটা পার করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে।

বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে (প্রস্তাবনা ৭১/৩২৩ অনুযায়ী), নির্বাচনের আগে গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে প্রার্থীদের নিয়ে একটি 'ইনফরমাল ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ' বা অনানুষ্ঠানিক মুখোমুখি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের প্রার্থী নিজ নিজ ভিশন স্টেটমেন্ট (Vision Statement) উপস্থাপন করেন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। ড. খলিলুর রহমানের আন্তর্জাতিক খ্যাতি, জাতিসংঘের সচিবালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর সিনিয়র পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) পক্ষে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের রেকর্ড সদস্য দেশগুলোকে ব্যাপকভাবে আশ্বস্ত করেছিল।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মেয়াদকাল নির্ধারিত ১ বছর। নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনের মাধ্যমে তাঁর কার্যভার গ্রহণ করবেন। তিনি বর্তমান সভাপতি, জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন। এই এক বছরের মেয়াদে, বিশেষ করে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক (General Debate) এবং পরবর্তী সমসাময়িক বৈশ্বিক সংকটের দিনগুলোতে তিনি বিশ্বমঞ্চের সভাপতিত্ব করবেন।

ড. খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন যখন বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর নিজের ভাষায়, "জাতিসংঘ আজ একাধিক ফ্রন্টে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি"। সভাপতি হিসেবে তাঁর মূল এজেন্ডাগুলোর মধ্যে থাকবে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা ও সংঘাত নিরসনে প্রতিরোধমূলক ও রাজনৈতিক সমাধান জোরদার করা। বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গভর্নেন্সের মতো উদীয়মান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জন্য এবং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য ড. খলিলুর রহমানের এই বৈশ্বিক বিজয় এক অবিস্মরণীয় কূটনৈতিক গৌরব। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের অংশীদার নয়, বরং বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা ও বিশ্বস্ততাও অর্জন করেছে। আমাদের যোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর প্রজ্ঞা, দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে সফলভাবে পরিচালনা করবেন এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন—রাজনীতি বিশ্লেষক ও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা ও দৃঢ় বিশ্বাস।

ড. খলিলুর রহমানকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, ইউএনজিএ ৮১তম অধিবেশন, ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতিসংঘ, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, ড. আসিফ মিজান, উপ-সম্পাদকীয়, প্রভাতী নিউজ UNGA President, UNGA 81st Session, Dr. Khalilur Rahman, Foreign Minister Bangladesh, United Nations, Multilateral Diplomacy, Dr. Asif Mizan, Op-Ed, Bangladesh Diplomatic Victory, Provati News

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


বিশ্ব কূটনীতির শীর্ষে বাংলাদেশ: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে ২ জুন ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের বৈশ্বিক ফোরাম—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বিপুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রার্থী, বহুপাক্ষিক কূটনীতির অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করে বাংলাদেশ এই গৌরবময় আসনটি পুনরুদ্ধার করেছে। ১৯০টি কাস্ট হওয়া ভোটের মধ্যে ড. খলিলুর রহমান পান ৯৯টি ভোট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯১টি ভোট। এই ঐতিহাসিক বিজয় বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, ভূ-রাজনৈতিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতায় আমাদের ইতিবাচক ভূমিকার এক বলিষ্ঠ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

আজ থেকে ঠিক চার দশক আগে, ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ড. খলিলুর রহমানের এই নির্বাচন বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের যোগ্যতার এক নতুন যুগের সূচনা করল। সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন পদ্ধতি, এর মেয়াদ, ভোটের সমীকরণ এবং এর একাডেমিক গুরুত্ব নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UNGA) হলো বিশ্বসংস্থার একমাত্র অঙ্গ যেখানে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সবার সমান প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং প্রত্যেকের একটি করে vote রয়েছে। একে প্রায়শই 'বিশ্বের আইনসভা' বা 'পার্লামেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড' বলা হয়।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি (President of the General Assembly - PGA) এই উচ্চপর্যায়ের পরিষদের অধিবেশনগুলো পরিচালনা করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের আলোচনা ও এজেন্ডা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করেন। যদিও পদটি মূলত তাত্ত্বিকভাবে এবং নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ ও সমন্বয়ধর্মী, তবুও বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন এবং বড় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনে এই পদের কূটনৈতিক ওজন অপরসিম।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি প্রতি বছর বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে আবর্তিত (Rotate) হয়। 

এই অঞ্চলগুলো হলো, আফ্রিকা গ্রুপ, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ, পূর্ব ইউরোপ গ্রুপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় গ্রুপ, পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য গ্রুপ

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হতে যাওয়া ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি নির্ধারিত ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য। সাধারণত এই গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের (Consensus) ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। তবে যখন কোনো গ্রুপ থেকে একাধিক রাষ্ট্র প্রার্থী দেয়, তখন বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভোটে গড়ায়। ৮১তম অধিবেশনের জন্য বাংলাদেশ এবং সাইপ্রাস উভয় দেশই এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে শক্ত প্রার্থী দেওয়ায় এবার সমঝোতার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

জাতিসংঘের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০ নম্বর ধারা (Rule 30 of the Rules of Procedure) অনুযায়ী সাধারণ পরিষদের হলে এই নির্বাচন সরাসরি গোপন ব্যালটের (Secret Ballot) মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। ২ জুন ২০২৬ নিউইয়র্ক সময় সকাল ১০টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৯০টি রাষ্ট্র এই নির্বাচনে ভোট প্রদান করে। কোনো ভোট বাতিল বা অনুপস্থিতি (Abstention) ছিল না। বিজয়ের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৯৬টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ ৯৯টি vote পেয়ে সেই কোটা পার করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে।

বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে (প্রস্তাবনা ৭১/৩২৩ অনুযায়ী), নির্বাচনের আগে গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে প্রার্থীদের নিয়ে একটি 'ইনফরমাল ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ' বা অনানুষ্ঠানিক মুখোমুখি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের প্রার্থী নিজ নিজ ভিশন স্টেটমেন্ট (Vision Statement) উপস্থাপন করেন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। ড. খলিলুর রহমানের আন্তর্জাতিক খ্যাতি, জাতিসংঘের সচিবালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর সিনিয়র পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) পক্ষে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের রেকর্ড সদস্য দেশগুলোকে ব্যাপকভাবে আশ্বস্ত করেছিল।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মেয়াদকাল নির্ধারিত ১ বছর। নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনের মাধ্যমে তাঁর কার্যভার গ্রহণ করবেন। তিনি বর্তমান সভাপতি, জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন। এই এক বছরের মেয়াদে, বিশেষ করে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক (General Debate) এবং পরবর্তী সমসাময়িক বৈশ্বিক সংকটের দিনগুলোতে তিনি বিশ্বমঞ্চের সভাপতিত্ব করবেন।

ড. খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন যখন বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর নিজের ভাষায়, "জাতিসংঘ আজ একাধিক ফ্রন্টে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি"। সভাপতি হিসেবে তাঁর মূল এজেন্ডাগুলোর মধ্যে থাকবে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা ও সংঘাত নিরসনে প্রতিরোধমূলক ও রাজনৈতিক সমাধান জোরদার করা। বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গভর্নেন্সের মতো উদীয়মান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জন্য এবং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য ড. খলিলুর রহমানের এই বৈশ্বিক বিজয় এক অবিস্মরণীয় কূটনৈতিক গৌরব। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের অংশীদার নয়, বরং বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা ও বিশ্বস্ততাও অর্জন করেছে। আমাদের যোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর প্রজ্ঞা, দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে সফলভাবে পরিচালনা করবেন এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন—রাজনীতি বিশ্লেষক ও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা ও দৃঢ় বিশ্বাস।

ড. খলিলুর রহমানকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত