সকালে যখন স্কুলের ঘণ্টা বাজে, তখন চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, পরিবহন খাত ও ইটভাটায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শত শত শিশু। তাদের কারও হাতে বই-খাতা নেই; আছে রেঞ্চ, হাতুড়ি কিংবা ভারী শ্রমের সরঞ্জাম। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার কারণে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুশ্রম।
আজ ১২ জুন, 'বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস'। এই বিশেষ দিনে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে শিশুশ্রমের এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র।
নগরের নিউ মার্কেট-নতুন ব্রিজ সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া তোলার কাজ করে ৯ বছর বয়সী শিশু সাকিব। সে জানায়, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখেনি সে। মা গার্মেন্টসে কাজ করলেও বর্তমানে কর্মহীন। সাকিব বলে, "প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে প্রায় ১০০ টাকা পাই। সেই টাকা দিয়ে নিজের খরচের পাশাপাশি মাকেও সাহায্য করি। কাজ না করলে ঘরে খাবার জুটবে না।"
অনুরূপ গল্প ১৩ বছর বয়সী রবিউলের। দুই বছর আগে আর্থিক সংকটে পড়ালেখা ছেড়ে আগ্রাবাদের একটি ওয়ার্কশপে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ শুরু করে সে। রবিউলের আক্ষেপ, "আমার ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করে বড় কিছু হওয়ার। এখনও বন্ধুদের স্কুলে যেতে দেখলে খারাপ লাগে।"
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার হার ৯.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬.৮ শতাংশ। এর ফলে দেশে প্রায় ১২ লাখ অতিরিক্ত শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে।
দেশে ১০ লাখের বেশি শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিবহন খাত, অটো গ্যারেজ, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, শুঁটকিপল্লি ও অনানুষ্ঠানিক খাত।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইপসা (YPSA)-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, "শিশুশ্রম শুধু শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকার শিশুশ্রম শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী হারুনুর রশীদ রুবেল বলেন, "শিশুরা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় অনেকেই শোষণের শিকার হচ্ছে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না।"
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন, কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত সরকারি তদারকি ও শিশুশ্রম বিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি। শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চাইল্ড হেল্পলাইনের (১০৯৮) ব্যবহার সহজলভ্য ও প্রচার করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর করা এবং শিশু সুরক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে না নিলে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
সকালে যখন স্কুলের ঘণ্টা বাজে, তখন চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, পরিবহন খাত ও ইটভাটায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শত শত শিশু। তাদের কারও হাতে বই-খাতা নেই; আছে রেঞ্চ, হাতুড়ি কিংবা ভারী শ্রমের সরঞ্জাম। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার কারণে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুশ্রম।
আজ ১২ জুন, 'বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস'। এই বিশেষ দিনে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে শিশুশ্রমের এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র।
নগরের নিউ মার্কেট-নতুন ব্রিজ সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া তোলার কাজ করে ৯ বছর বয়সী শিশু সাকিব। সে জানায়, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখেনি সে। মা গার্মেন্টসে কাজ করলেও বর্তমানে কর্মহীন। সাকিব বলে, "প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে প্রায় ১০০ টাকা পাই। সেই টাকা দিয়ে নিজের খরচের পাশাপাশি মাকেও সাহায্য করি। কাজ না করলে ঘরে খাবার জুটবে না।"
অনুরূপ গল্প ১৩ বছর বয়সী রবিউলের। দুই বছর আগে আর্থিক সংকটে পড়ালেখা ছেড়ে আগ্রাবাদের একটি ওয়ার্কশপে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ শুরু করে সে। রবিউলের আক্ষেপ, "আমার ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করে বড় কিছু হওয়ার। এখনও বন্ধুদের স্কুলে যেতে দেখলে খারাপ লাগে।"
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার হার ৯.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬.৮ শতাংশ। এর ফলে দেশে প্রায় ১২ লাখ অতিরিক্ত শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে।
দেশে ১০ লাখের বেশি শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিবহন খাত, অটো গ্যারেজ, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, শুঁটকিপল্লি ও অনানুষ্ঠানিক খাত।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইপসা (YPSA)-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, "শিশুশ্রম শুধু শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকার শিশুশ্রম শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী হারুনুর রশীদ রুবেল বলেন, "শিশুরা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় অনেকেই শোষণের শিকার হচ্ছে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না।"
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন, কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত সরকারি তদারকি ও শিশুশ্রম বিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি। শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চাইল্ড হেল্পলাইনের (১০৯৮) ব্যবহার সহজলভ্য ও প্রচার করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর করা এবং শিশু সুরক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে না নিলে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আপনার মতামত লিখুন