রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের একটি জীর্ণ মাটির ঘর। চারদিকে তীব্র অভাব-অনটন, নেই কোনো জমিজমা কিংবা সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক রূপালী স্বপ্ন—সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে একদিন ডাক্তার হবেন, সেবা করবেন অবহেলিত মানুষের।
সেই স্বপ্নের পথে বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছেন মাহমুদা খাতুন। চা বিক্রেতা বাবার সীমাহীন কষ্ট আর নিজের অদম্য মেধার জোরে তিনি এবার জামালপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে অভাবকে হারিয়ে মেডিকেলের বারান্দায় পৌঁছালেও, মাহমুদার সামনে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকটের কঠিন বাস্তবতা।
চা বিক্রেতা বাবা মাসুদ রানা ও গৃহিণী মা সায়েরা বিবির দুই মেয়ের মধ্যে মাহমুদা বড়। ছোট বোন মিম খাতুন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের মেধার সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রেখেছেন মাহমুদা। ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা লেখাপড়া জানি না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি অসম্ভব আগ্রহ ছিল। অনেক সময় নিজেরা না খেয়ে থেকেছি, তবুও মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়েছি। প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না, সে নিজের চেষ্টায় এতদূর এসেছে।”
প্রতিদিন চা বিক্রি করে মাসুদ রানার আয় হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কোনো দিন আবার মানুষের জমিতে দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন। এই অল্প আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে মেয়ের মেডিকেল শিক্ষার ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
মাসুদ রানা জানান, "মেডিকেলে ভর্তি হতে ১৩ হাজার টাকা লেগেছে, যা ধার করে জোগাড় করেছি। এখন নতুন বই কিনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগবে। এছাড়া কলেজ থেকে একটি ‘স্কেলিটন’ (কঙ্কাল মডেল) কিনতে বলা হয়েছে, যার দাম প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এত টাকা কোথায় পাবো, বুঝতে পারছি না।"
শুধু শিক্ষাসামগ্রী নয়, প্রতি মাসে হোস্টেল খরচ, খাওয়া-দাওয়া ও খাতা-কলমসহ আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার প্রয়োজন। মাহমুদার মা সায়েরা বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই। মাত্র দুই শতক জমির ওপর মাটির ও বেড়ার ঘরে থাকি। অর্থের অভাবে যদি আমার মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়, তবে সেটি শুধু আমাদের নয়, সমাজেরও ক্ষতি।
বর্তমানে জামালপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে হোস্টেলে উঠেছেন মাহমুদা। কিন্তু প্রয়োজনীয় বইপত্র এখনও সংগ্রহ করতে পারেননি।
মোবাইল ফোনে মাহমুদা বলেন, “অনেক বই এখনও কিনতে পারিনি। অন্যের বই ধার করে দেখতে হচ্ছে। কলেজ থেকে স্কেলিটন কিনতে বলেছে, কিন্তু বাবার পক্ষে সেটি কেনা সম্ভব নয়। আমি শুধু চাই, আমার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।”
প্রতিবেশী হেলাল উদ্দিন বলেন, “মাহমুদা অভাবের মধ্যেও কখনও হাল ছাড়েনি। গ্রামের একজন চা বিক্রেতার মেয়ে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে, এটি পুরো এলাকার গর্ব। সমাজের বিত্তবানদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।”
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, “এমন একটি সংগ্রামী পরিবার থেকে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া পুরো তানোর উপজেলার জন্য গর্বের বিষয়। তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। তবে শুধু সরকারি সহায়তা নয়, সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”
অভাবের দেয়াল ভেঙে মাহমুদা আজ মেডিকেল কলেজের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছেছেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণের পথ এখনও দীর্ঘ ও মসৃণ নয়। সমাজের সহমর্মিতা ও মানবিকতাই পারে মাহমুদাকে পৌঁছে দিতে সাদা অ্যাপ্রনের সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
সংগ্রামী এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর পড়ালেখা সচল রাখতে যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়াতে চান, তবে সরাসরি মাহমুদার বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
মাসুদ রানা (মাহমুদার বাবা): ০১৭৯৬-৮৮১৪৪৯ (বিকাশ/নগদ বা সরাসরি যোগাযোগের জন্য)

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের একটি জীর্ণ মাটির ঘর। চারদিকে তীব্র অভাব-অনটন, নেই কোনো জমিজমা কিংবা সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক রূপালী স্বপ্ন—সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে একদিন ডাক্তার হবেন, সেবা করবেন অবহেলিত মানুষের।
সেই স্বপ্নের পথে বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছেন মাহমুদা খাতুন। চা বিক্রেতা বাবার সীমাহীন কষ্ট আর নিজের অদম্য মেধার জোরে তিনি এবার জামালপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে অভাবকে হারিয়ে মেডিকেলের বারান্দায় পৌঁছালেও, মাহমুদার সামনে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকটের কঠিন বাস্তবতা।
চা বিক্রেতা বাবা মাসুদ রানা ও গৃহিণী মা সায়েরা বিবির দুই মেয়ের মধ্যে মাহমুদা বড়। ছোট বোন মিম খাতুন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের মেধার সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রেখেছেন মাহমুদা। ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা লেখাপড়া জানি না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি অসম্ভব আগ্রহ ছিল। অনেক সময় নিজেরা না খেয়ে থেকেছি, তবুও মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়েছি। প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না, সে নিজের চেষ্টায় এতদূর এসেছে।”
প্রতিদিন চা বিক্রি করে মাসুদ রানার আয় হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কোনো দিন আবার মানুষের জমিতে দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন। এই অল্প আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে মেয়ের মেডিকেল শিক্ষার ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
মাসুদ রানা জানান, "মেডিকেলে ভর্তি হতে ১৩ হাজার টাকা লেগেছে, যা ধার করে জোগাড় করেছি। এখন নতুন বই কিনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগবে। এছাড়া কলেজ থেকে একটি ‘স্কেলিটন’ (কঙ্কাল মডেল) কিনতে বলা হয়েছে, যার দাম প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এত টাকা কোথায় পাবো, বুঝতে পারছি না।"
শুধু শিক্ষাসামগ্রী নয়, প্রতি মাসে হোস্টেল খরচ, খাওয়া-দাওয়া ও খাতা-কলমসহ আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার প্রয়োজন। মাহমুদার মা সায়েরা বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই। মাত্র দুই শতক জমির ওপর মাটির ও বেড়ার ঘরে থাকি। অর্থের অভাবে যদি আমার মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়, তবে সেটি শুধু আমাদের নয়, সমাজেরও ক্ষতি।
বর্তমানে জামালপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে হোস্টেলে উঠেছেন মাহমুদা। কিন্তু প্রয়োজনীয় বইপত্র এখনও সংগ্রহ করতে পারেননি।
মোবাইল ফোনে মাহমুদা বলেন, “অনেক বই এখনও কিনতে পারিনি। অন্যের বই ধার করে দেখতে হচ্ছে। কলেজ থেকে স্কেলিটন কিনতে বলেছে, কিন্তু বাবার পক্ষে সেটি কেনা সম্ভব নয়। আমি শুধু চাই, আমার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।”
প্রতিবেশী হেলাল উদ্দিন বলেন, “মাহমুদা অভাবের মধ্যেও কখনও হাল ছাড়েনি। গ্রামের একজন চা বিক্রেতার মেয়ে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে, এটি পুরো এলাকার গর্ব। সমাজের বিত্তবানদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।”
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, “এমন একটি সংগ্রামী পরিবার থেকে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া পুরো তানোর উপজেলার জন্য গর্বের বিষয়। তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। তবে শুধু সরকারি সহায়তা নয়, সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”
অভাবের দেয়াল ভেঙে মাহমুদা আজ মেডিকেল কলেজের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছেছেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণের পথ এখনও দীর্ঘ ও মসৃণ নয়। সমাজের সহমর্মিতা ও মানবিকতাই পারে মাহমুদাকে পৌঁছে দিতে সাদা অ্যাপ্রনের সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
সংগ্রামী এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর পড়ালেখা সচল রাখতে যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়াতে চান, তবে সরাসরি মাহমুদার বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
মাসুদ রানা (মাহমুদার বাবা): ০১৭৯৬-৮৮১৪৪৯ (বিকাশ/নগদ বা সরাসরি যোগাযোগের জন্য)

আপনার মতামত লিখুন