গানের সুরে বা কবিতার ছন্দে অবচেতন মনে এমন অনেক শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয়, যা ইসলামের মূল আকীদা বা বিশ্বাসের ভিতকে ধূলিসাৎ করে দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো 'শিরক' বা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা। সচেতন বা অবচেতনভাবে এই ধরনের গান গাওয়া, শোনা বা প্রচার করা ইমানের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
বিশিষ্ট অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও গবেষক মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী প্রচলিত কিছু গানের মারাত্মক শিরকি উপাদান এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে এর ভয়াবহতা চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
১. "আখির ওয়াহি কিয়ে সাজদে যাহা সার ঝুকানা মানা থা"
অর্থ: "যেখানে মাথা নত করা নিষিদ্ধ ছিল, শেষ পর্যন্ত সেখানেই মাথা নত (সিজদা) করা হলো।" (সাধারণত মানুষের প্রতি অন্ধ ভক্তি বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়)।
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: সিজদা বা চূড়ান্ত মস্তক অবনতি কেবল একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। প্রেম-ভালোবাসা বা অতি ভক্তির বশেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা সৃষ্টির সামনে সিজদা করা স্পষ্ট শিরক ও কাবিরা গুনাহ।
২. "তুঝমে রাব দেখতা হ্যায়, ইয়ারা ম্যায় কিয়া করুঁ"
অর্থ: "তোমার মাঝে আমি ঈশ্বরকে (রব) দেখতে পাই, হে বন্ধু আমি এখন কী করি! তোমার সামনে আমার মাথা সেজদায় নত হয়ে আসে।"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব খোঁজা বা তাকে দেখে 'রব' বা খোদা মনে করা এবং তার সামনে সিজদাবনত হওয়া 'শিরকে আকবর' বা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৩. "ম্যায় দুনিয়া ভর কি তারিফেঁ তেরে সাজদে মে লায়া হুঁ, ম্যায় তুমসে ইশক করনে কি ইজাজত রব সে লায়া হুঁ"
অর্থ: "আমি সারা পৃথিবীর সমস্ত প্রশংসা তোমার চরণে (সেজদায়) উৎসর্গ করতে এনেছি, আমি তোমার সাথে প্রেম করার অনুমতি স্বয়ং ঈশ্বরের (রব) কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: পৃথিবীর সমস্ত প্রশংসা এবং সিজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য, তা কোনো সৃষ্টির চরণে উৎসর্গ করা যায় না। এছাড়া আল্লাহর নামে এমন মিথ্যাচার করাও কুফরির শামিল।
৪. "বেলতলী সোলেমান ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা, কাটাকেল্লা কাটাকেল্লা, কেল্লায় করে আল্লাহ আল্লাহ"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: ইসলামে কোনো মৃত ব্যক্তি, পীর বা অলির নামে 'দোহাই' দেওয়া বা তাদের কাছে অলৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহাশক্তি ও সর্বাত্মক দোহাই বা আশ্রয়ের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও অলৌকিক দোহাই দেওয়া স্পষ্ট শিরক।
৫. "আমি জানলে কি আর করতাম গুনাহ বাবা মাওলানা, না জানিয়া ভুল করেছি ক্ষমা করো না"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, গুনাহ বা পাপ মার্জনা করার একচ্ছত্র অধিকার কেবল মহান আল্লাহর। কোনো পীর, অলি বা মানুষের কাছে পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা তাকে ক্ষমাকারী মনে করা ইসলামের তৌহিদী বিশ্বাসের পরিপন্থী।
৬. "খাদেম রমেশের বাণী প্রাণ দিয়েছি পীর কদমে যা করেন তিনি"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে— "আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।" (সূরা আন-আম: ১৬২)। পীরের পায়ে বা কদমে জীবন উৎসর্গ করার কথা বলা এই অমোঘ বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পবিত্র কোরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক শিরক হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ ও জুলুম, যা মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।
১. আল্লাহ তা'আলা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শিরকের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। আর ইহা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা (তার অন্যান্য অপরাধ) ক্ষমা করে দেন। এবং যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে এক বিরাট সত্য হতে বিচ্যুত হয়ে মহাসত্যের অপবাদ রটনা করে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)
২. লোকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ: “যখন লোকমান তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বললেনঃ হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শিরক করো না; কেননা শিরক সবচেয়ে বড় অন্যায়।” (সূরা লোকমান, ৩১:১৩)
৩. জান্নাত হারাম হওয়ার ঘোষণা: "নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ, ৫:৭২)
৪. আমল নিষ্ফল হওয়ার হুঁশিয়ারি: আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবীকে সাবধান করে বলেন— “আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
৫. হাদিসের বাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরিক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরিক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সহিহ মুসলিম, ৯৩)
বিনোদন বা অবহেলার ছলে আমরা যেন এমন কোনো কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ না করি কিংবা এমন কোনো গান না শুনি, যা আমাদের ইমানকে ধ্বংস করে দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের যাবতীয় দৃশ্য-অদৃশ্য, জানা-অজানা শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ শিরকি গান, প্রচলিত গানের শিরক, মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী, শিরকের ভয়াবহতা, ইসলামে গান শোনার বিধান, তৌহিদ ও শিরক, ইমান রক্ষার উপায়, ধর্ম ডেস্ক, Shirki Song, Shirk in Common Songs, Severity of Shirk, Islamic Rules on Songs, Tawheed and Shirk, Protecting Iman, Islamic QA, Religion News

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
গানের সুরে বা কবিতার ছন্দে অবচেতন মনে এমন অনেক শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয়, যা ইসলামের মূল আকীদা বা বিশ্বাসের ভিতকে ধূলিসাৎ করে দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো 'শিরক' বা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা। সচেতন বা অবচেতনভাবে এই ধরনের গান গাওয়া, শোনা বা প্রচার করা ইমানের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
বিশিষ্ট অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও গবেষক মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী প্রচলিত কিছু গানের মারাত্মক শিরকি উপাদান এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে এর ভয়াবহতা চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
১. "আখির ওয়াহি কিয়ে সাজদে যাহা সার ঝুকানা মানা থা"
অর্থ: "যেখানে মাথা নত করা নিষিদ্ধ ছিল, শেষ পর্যন্ত সেখানেই মাথা নত (সিজদা) করা হলো।" (সাধারণত মানুষের প্রতি অন্ধ ভক্তি বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়)।
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: সিজদা বা চূড়ান্ত মস্তক অবনতি কেবল একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। প্রেম-ভালোবাসা বা অতি ভক্তির বশেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা সৃষ্টির সামনে সিজদা করা স্পষ্ট শিরক ও কাবিরা গুনাহ।
২. "তুঝমে রাব দেখতা হ্যায়, ইয়ারা ম্যায় কিয়া করুঁ"
অর্থ: "তোমার মাঝে আমি ঈশ্বরকে (রব) দেখতে পাই, হে বন্ধু আমি এখন কী করি! তোমার সামনে আমার মাথা সেজদায় নত হয়ে আসে।"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব খোঁজা বা তাকে দেখে 'রব' বা খোদা মনে করা এবং তার সামনে সিজদাবনত হওয়া 'শিরকে আকবর' বা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৩. "ম্যায় দুনিয়া ভর কি তারিফেঁ তেরে সাজদে মে লায়া হুঁ, ম্যায় তুমসে ইশক করনে কি ইজাজত রব সে লায়া হুঁ"
অর্থ: "আমি সারা পৃথিবীর সমস্ত প্রশংসা তোমার চরণে (সেজদায়) উৎসর্গ করতে এনেছি, আমি তোমার সাথে প্রেম করার অনুমতি স্বয়ং ঈশ্বরের (রব) কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: পৃথিবীর সমস্ত প্রশংসা এবং সিজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য, তা কোনো সৃষ্টির চরণে উৎসর্গ করা যায় না। এছাড়া আল্লাহর নামে এমন মিথ্যাচার করাও কুফরির শামিল।
৪. "বেলতলী সোলেমান ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা, কাটাকেল্লা কাটাকেল্লা, কেল্লায় করে আল্লাহ আল্লাহ"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: ইসলামে কোনো মৃত ব্যক্তি, পীর বা অলির নামে 'দোহাই' দেওয়া বা তাদের কাছে অলৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহাশক্তি ও সর্বাত্মক দোহাই বা আশ্রয়ের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও অলৌকিক দোহাই দেওয়া স্পষ্ট শিরক।
৫. "আমি জানলে কি আর করতাম গুনাহ বাবা মাওলানা, না জানিয়া ভুল করেছি ক্ষমা করো না"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, গুনাহ বা পাপ মার্জনা করার একচ্ছত্র অধিকার কেবল মহান আল্লাহর। কোনো পীর, অলি বা মানুষের কাছে পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা তাকে ক্ষমাকারী মনে করা ইসলামের তৌহিদী বিশ্বাসের পরিপন্থী।
৬. "খাদেম রমেশের বাণী প্রাণ দিয়েছি পীর কদমে যা করেন তিনি"
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ: পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে— "আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।" (সূরা আন-আম: ১৬২)। পীরের পায়ে বা কদমে জীবন উৎসর্গ করার কথা বলা এই অমোঘ বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পবিত্র কোরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক শিরক হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ ও জুলুম, যা মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।
১. আল্লাহ তা'আলা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শিরকের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। আর ইহা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা (তার অন্যান্য অপরাধ) ক্ষমা করে দেন। এবং যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে এক বিরাট সত্য হতে বিচ্যুত হয়ে মহাসত্যের অপবাদ রটনা করে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)
২. লোকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ: “যখন লোকমান তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বললেনঃ হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শিরক করো না; কেননা শিরক সবচেয়ে বড় অন্যায়।” (সূরা লোকমান, ৩১:১৩)
৩. জান্নাত হারাম হওয়ার ঘোষণা: "নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ, ৫:৭২)
৪. আমল নিষ্ফল হওয়ার হুঁশিয়ারি: আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবীকে সাবধান করে বলেন— “আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।” (সূরা যুমার, ৩৯:৬৫)
৫. হাদিসের বাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরিক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরিক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সহিহ মুসলিম, ৯৩)
বিনোদন বা অবহেলার ছলে আমরা যেন এমন কোনো কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ না করি কিংবা এমন কোনো গান না শুনি, যা আমাদের ইমানকে ধ্বংস করে দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের যাবতীয় দৃশ্য-অদৃশ্য, জানা-অজানা শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন