একদিকে রাজস্ব আদায়ে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ঘাটতি, অন্যদিকে প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না আসা—এই দুই সংকটের মুখে পড়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সচল রাখতে গিয়ে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরু (জুলাই) থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ, মে মাসের প্রথমার্ধেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে।
অর্থবছরের শুরুতে ঋণের স্থিতি: ৫ লাখ ৫০,৯০৫ কোটি টাকা। ১০ মাস পর ঋণের স্থিতি: ৬ লাখ ৬০,৪৭৩ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সাধারণত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। ১০ মে পর্যন্ত নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে: ৫,১১৫ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দিয়েছে: ১ লাখ ৪,৪৫৩ কোটি টাকা (ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে)।
"বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর তারল্য কমে যায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।"
— মোহাম্মদ নূরুল আমিন, সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি এবং বর্তমান চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময়ে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি হ্রাসের কারণে রাজস্ব আদায় থমকে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। এর সঙ্গে আইএমএফের (IMF) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে কিছুটা ধীরগতি ও বিদেশি অর্থায়নে অনিশ্চয়তা সরকারকে ব্যাংকমুখী হতে বাধ্য করেছে।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ঋণনির্ভর এই ব্যয় ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ ব্যাংক ঋণ, বাজেট ঘাটতি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাজস্ব ঘাটতি, এনবিআর, অর্থসংকট, বাংলাদেশ অর্থনীতি, অন্তর্বর্তী সরকার Government Bank Borrowing, Budget Deficit, Bangladesh Bank, Commercial Banks, Revenue Shortfall, NBR, Financial Crisis, Bangladesh Economy, Interim Government

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
একদিকে রাজস্ব আদায়ে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ঘাটতি, অন্যদিকে প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না আসা—এই দুই সংকটের মুখে পড়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সচল রাখতে গিয়ে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরু (জুলাই) থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ, মে মাসের প্রথমার্ধেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে।
অর্থবছরের শুরুতে ঋণের স্থিতি: ৫ লাখ ৫০,৯০৫ কোটি টাকা। ১০ মাস পর ঋণের স্থিতি: ৬ লাখ ৬০,৪৭৩ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সাধারণত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। ১০ মে পর্যন্ত নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে: ৫,১১৫ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দিয়েছে: ১ লাখ ৪,৪৫৩ কোটি টাকা (ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে)।
"বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর তারল্য কমে যায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।"
— মোহাম্মদ নূরুল আমিন, সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি এবং বর্তমান চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময়ে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি হ্রাসের কারণে রাজস্ব আদায় থমকে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। এর সঙ্গে আইএমএফের (IMF) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে কিছুটা ধীরগতি ও বিদেশি অর্থায়নে অনিশ্চয়তা সরকারকে ব্যাংকমুখী হতে বাধ্য করেছে।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ঋণনির্ভর এই ব্যয় ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

আপনার মতামত লিখুন