দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে সংকটে থাকা আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিন মাসের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বোর্ড ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসানোর তালিকায় থাকা বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া ৫টি প্রতিষ্ঠান হলো: ১. এফএএস (FAS) ফাইন্যান্স ২. ফারইস্ট ফাইন্যান্স ৩. আভিভা ফাইন্যান্স ৪. পিপলস লিজিং ৫. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৯৯.৯৯%। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯.৪৪%, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮.৫০%, পিপলস লিজিংয়ে প্রায় ৯৫% এবং আভিভা ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণের হার ৯৩.৯৩%।
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে এবং ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা প্রমাণ করতে বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স। এই সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হলে এগুলোকেও অবসায়ন বা রেজুলেশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া পাঁচটি এনবিএফআইতে ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। প্রথমে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যেখানে প্রাথমিক ধাপে প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন।
বর্তমানে সংকটে থাকা মোট ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আকাশচুম্বী হয়েছে। আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত পি কে হালদারের সংশ্লিষ্টতার কারণে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্স খাদের কিনারে এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্স ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম) নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান।
২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’ এর ৭(১) ও ৭(২) ধারা অনুযায়ী আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম ও মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতার দায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২০টিকেই ‘সমস্যাগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি।
অর্থাৎ এই অংশে খেলাপি ঋণের হার ৮৩.১৬%। বিপরীতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা বাকি ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে সংকটে থাকা আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিন মাসের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বোর্ড ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসানোর তালিকায় থাকা বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া ৫টি প্রতিষ্ঠান হলো: ১. এফএএস (FAS) ফাইন্যান্স ২. ফারইস্ট ফাইন্যান্স ৩. আভিভা ফাইন্যান্স ৪. পিপলস লিজিং ৫. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৯৯.৯৯%। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯.৪৪%, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯৮.৫০%, পিপলস লিজিংয়ে প্রায় ৯৫% এবং আভিভা ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণের হার ৯৩.৯৩%।
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে এবং ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা প্রমাণ করতে বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স। এই সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হলে এগুলোকেও অবসায়ন বা রেজুলেশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া পাঁচটি এনবিএফআইতে ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। প্রথমে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যেখানে প্রাথমিক ধাপে প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন।
বর্তমানে সংকটে থাকা মোট ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আকাশচুম্বী হয়েছে। আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত পি কে হালদারের সংশ্লিষ্টতার কারণে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্স খাদের কিনারে এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্স ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম) নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান।
২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’ এর ৭(১) ও ৭(২) ধারা অনুযায়ী আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম ও মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতার দায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২০টিকেই ‘সমস্যাগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি।
অর্থাৎ এই অংশে খেলাপি ঋণের হার ৮৩.১৬%। বিপরীতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা বাকি ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

আপনার মতামত লিখুন