রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজার নিকুঞ্জ-২ সংলগ্ন খিলক্ষেত টানপাড়া ও আশপাশের এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা দীর্ঘ প্রশাসনিক বেড়াজালে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের গেজেট নোটিফিকেশন এবং সর্বশেষ ঢাকা মহানগর জরিপে (সিটি সার্ভে) জমি ব্যক্তিমালিকানায় চূড়ান্তভাবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পরও এক অদৃশ্য কারণে এলাকায় জমির নামজারি (ই-নামজারি) ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) গ্রহণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে নিজেদের পৈতৃক ও বৈধ সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা এবং আইনি অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক হয়রানির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ ভূমি মালিকরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সংকটের গোড়াপত্তন হয়েছিল পাকিস্তানি আমলে। ১৯৬১-৬২ সালে তৎকালীন সরকার এল.এ. কেস নং ১৩৮/৬১-৬২ এর আওতায় জোয়ার সাহারা মৌজার বিস্তীর্ণ ভূমি বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়। তবে খিলক্ষেত টানপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকার জমির বাস্তব দখল সরকার কখনোই গ্রহণ করেনি। এমনকি আইনানুগ নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট আদি মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণও প্রদান করা হয়নি। ফলে জমির প্রকৃত মালিকরা যুগের পর যুগ ধরে বংশানুক্রমে এই জমিতেই বসবাস করে আসছেন এবং ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, মাঠপর্যায়ের জটিল সমীক্ষা এবং নানামুখী আইনি পর্যালোচনার পর ২০১৭ সালের ২২ জুন ভূমি মন্ত্রণালয় একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর ভূমি মূল ব্যক্তিমালিকদের অনুকূলে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত ঘোষণা করা হয়। সরকারি নির্দেশনা ও শর্ত অনুসরণ করে শত শত ভূমি মালিক তৎকালীন সময়ে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অর্থ চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেন এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের অধিগ্রহণ শাখা থেকে আইনি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংগ্রহ করেন।
পরবর্তীতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ঢাকা মহানগর জরিপে (সিটি সার্ভে) সংশ্লিষ্ট সব সরকারী দপ্তরের কঠোর যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের পর এই ভূমিগুলো প্রকৃত মালিকদের নামে চূড়ান্তভাবে রেকর্ডভুক্ত ও প্রকাশিত হয়।
আইনগতভাবে সিটি জরিপ চূড়ান্ত হওয়ার পর নামজারি ও খাজনা চালু হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও স্থানীয় ভূমি প্রশাসন বিগত প্রায় এক যুগ ধরে আরএস রেকর্ডের একটি পুরোনো কারিগরি ত্রুটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকায় ই-নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রেখে দিয়েছে।
ভূমি সংক্রান্ত স্বাভাবিক প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকায় এই এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বর্তমানে এই এলাকার কেউ: চিকিৎসার জরুরি খরচ মেটাতে জমি বিক্রি করতে পারছেন না।সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক থেকে কোনো বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করতে পারছেন না।পারিবারিক সম্পত্তি নিয়মমাফিক বণ্টন বা হেবা দলিল করতে পারছেন না। রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করিয়ে বৈধ কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এই দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক দালাল, ভুঁইফোড় সমবায় সমিতি ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। নিরুপায় সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে অসাধু চক্রের দ্বারস্থ হয়ে কোটি কোটি টাকা খুইয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে 'নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি'-র আহ্বায়ক জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"খিলক্ষেত টানপাড়ার মানুষ কোনো অবৈধ বা অযৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে না। আমরা শুধু চাই আমাদের বৈধ কাগজপত্র, সরকারের নিজস্ব গেজেট এবং চূড়ান্ত সিটি ভূমি রেকর্ডের আলোকে নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকারটুকু নিশ্চিত হোক। একটি স্বাধীন দেশে নিজের পৈতৃক জমির মালিক হয়েও যদি মানুষ নামজারি করতে না পারে, খাজনা দিয়ে দাখিলা কাটতে না পারে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই জটিলতার কারণে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা আজ ধ্বংসের মুখে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার ও ভূমি মন্ত্রণালয় বিষয়টি দ্রুত জনস্বার্থে খতিয়ে দেখবে।"
১. আরএস রেকর্ডের পুরোনো ও অকার্যকর ত্রুটির অজুহাতে সাধারণ নাগরিকদের আর হয়রানি করা চলবে না। ২. একবার ডিসি অফিস থেকে এনওসি নেওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে পুনরায় নতুন করে অনাপত্তি সনদের নামে যেন নতুন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা না হয়। ৩. ২০১৭ সালের সরকারি গেজেট ও সর্বশেষ সিটি জরিপের ওপর ভিত্তি করে অবিলম্বে খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকায় ই-নামজারি ও খাজনা প্রদান প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মানবিক ও আইনি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়, ভূমি সচিব এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনতা।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ বাংলা ট্যাগ: খিলক্ষেত টানপাড়া, জোয়ার সাহারা মৌজা, ই-নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খাজনা বন্ধ, ভূমি মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর জরিপ, সিটি সার্ভে, নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভূমি হয়রানি English Tags: Khilkhet Tanpara, Joar Sahara Mouza, E-Namjari, Land Mutation, Land Tax, Ministry of Land, Dhaka City Survey, Bureaucratic Complexity, Land Rights Bangladesh, Khilkhet Land Issue

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজার নিকুঞ্জ-২ সংলগ্ন খিলক্ষেত টানপাড়া ও আশপাশের এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা দীর্ঘ প্রশাসনিক বেড়াজালে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের গেজেট নোটিফিকেশন এবং সর্বশেষ ঢাকা মহানগর জরিপে (সিটি সার্ভে) জমি ব্যক্তিমালিকানায় চূড়ান্তভাবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পরও এক অদৃশ্য কারণে এলাকায় জমির নামজারি (ই-নামজারি) ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) গ্রহণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে নিজেদের পৈতৃক ও বৈধ সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা এবং আইনি অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক হয়রানির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ ভূমি মালিকরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সংকটের গোড়াপত্তন হয়েছিল পাকিস্তানি আমলে। ১৯৬১-৬২ সালে তৎকালীন সরকার এল.এ. কেস নং ১৩৮/৬১-৬২ এর আওতায় জোয়ার সাহারা মৌজার বিস্তীর্ণ ভূমি বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়। তবে খিলক্ষেত টানপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকার জমির বাস্তব দখল সরকার কখনোই গ্রহণ করেনি। এমনকি আইনানুগ নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট আদি মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণও প্রদান করা হয়নি। ফলে জমির প্রকৃত মালিকরা যুগের পর যুগ ধরে বংশানুক্রমে এই জমিতেই বসবাস করে আসছেন এবং ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, মাঠপর্যায়ের জটিল সমীক্ষা এবং নানামুখী আইনি পর্যালোচনার পর ২০১৭ সালের ২২ জুন ভূমি মন্ত্রণালয় একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর ভূমি মূল ব্যক্তিমালিকদের অনুকূলে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত ঘোষণা করা হয়। সরকারি নির্দেশনা ও শর্ত অনুসরণ করে শত শত ভূমি মালিক তৎকালীন সময়ে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অর্থ চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেন এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের অধিগ্রহণ শাখা থেকে আইনি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংগ্রহ করেন।
পরবর্তীতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ঢাকা মহানগর জরিপে (সিটি সার্ভে) সংশ্লিষ্ট সব সরকারী দপ্তরের কঠোর যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের পর এই ভূমিগুলো প্রকৃত মালিকদের নামে চূড়ান্তভাবে রেকর্ডভুক্ত ও প্রকাশিত হয়।
আইনগতভাবে সিটি জরিপ চূড়ান্ত হওয়ার পর নামজারি ও খাজনা চালু হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও স্থানীয় ভূমি প্রশাসন বিগত প্রায় এক যুগ ধরে আরএস রেকর্ডের একটি পুরোনো কারিগরি ত্রুটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকায় ই-নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রেখে দিয়েছে।
ভূমি সংক্রান্ত স্বাভাবিক প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকায় এই এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বর্তমানে এই এলাকার কেউ: চিকিৎসার জরুরি খরচ মেটাতে জমি বিক্রি করতে পারছেন না।সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক থেকে কোনো বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করতে পারছেন না।পারিবারিক সম্পত্তি নিয়মমাফিক বণ্টন বা হেবা দলিল করতে পারছেন না। রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করিয়ে বৈধ কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এই দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক দালাল, ভুঁইফোড় সমবায় সমিতি ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। নিরুপায় সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে অসাধু চক্রের দ্বারস্থ হয়ে কোটি কোটি টাকা খুইয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে 'নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি'-র আহ্বায়ক জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"খিলক্ষেত টানপাড়ার মানুষ কোনো অবৈধ বা অযৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে না। আমরা শুধু চাই আমাদের বৈধ কাগজপত্র, সরকারের নিজস্ব গেজেট এবং চূড়ান্ত সিটি ভূমি রেকর্ডের আলোকে নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকারটুকু নিশ্চিত হোক। একটি স্বাধীন দেশে নিজের পৈতৃক জমির মালিক হয়েও যদি মানুষ নামজারি করতে না পারে, খাজনা দিয়ে দাখিলা কাটতে না পারে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই জটিলতার কারণে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা আজ ধ্বংসের মুখে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার ও ভূমি মন্ত্রণালয় বিষয়টি দ্রুত জনস্বার্থে খতিয়ে দেখবে।"
১. আরএস রেকর্ডের পুরোনো ও অকার্যকর ত্রুটির অজুহাতে সাধারণ নাগরিকদের আর হয়রানি করা চলবে না। ২. একবার ডিসি অফিস থেকে এনওসি নেওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে পুনরায় নতুন করে অনাপত্তি সনদের নামে যেন নতুন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা না হয়। ৩. ২০১৭ সালের সরকারি গেজেট ও সর্বশেষ সিটি জরিপের ওপর ভিত্তি করে অবিলম্বে খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকায় ই-নামজারি ও খাজনা প্রদান প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মানবিক ও আইনি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়, ভূমি সচিব এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনতা।

আপনার মতামত লিখুন