প্রতি বছর ৫ জুন যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ফিরে আসে, তখন সভ্যতার খতিয়ান মেলাতে গিয়ে এক গভীর আত্মগ্লানি ভর করে। ১৯৭৪ সাল থেকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর উদ্যোগে এই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—"প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য"।
কিন্তু এই জমকালো স্লোগান আর অমোঘ বাণীর সমান্তরালে আজ এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা। প্রকৃতি আজ আর স্রেফ কোনো জড় উপাদান নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। অথচ পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর রাজনীতির দাবার চালে এই জীবন্ত সত্তা আজ দিনে দিনে আরও রুগ্ন, আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্দরমহল এবং পরিবেশ সংকটের গভীরতা যখন মেলাই, তখন একটি চরম বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ধরিত্রী ধ্বংসের মহোৎসব চলছে অবলীলায়, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। এই আন্দোলনের অন্তরালে সুকৌশলে জড়িয়ে আছে ‘পরিবেশ রক্ষার কূটনীতি’ বা 'Eco-politics'।
বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলো (COP) আজ কার্যকর সমাধানের চেয়ে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চালবাজি, কার্বন-ট্রেডিংয়ের হিসাব-নিকাশ এবং বাণিজ্যিক দরকষাকষির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান ও বাস্তবতার নিরিখে পরিবেশ রক্ষার যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তা এই রাজনীতির চালে ও আমলাতান্ত্রিক জালে আটকা পড়ে দমবন্ধ হয়ে মরছে।
সোমালিয়ার শুষ্ক, রুক্ষ মাটি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দিকে তাকালে এই সংকটের নৈতিক স্খলনটি পরিষ্কার বোঝা যায়।
জলবায়ু বিজ্ঞানের ডেটা বলছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অবদান ১ শতাংশেরও কম।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও প্রধান নির্মম ধাক্কাটি এই দেশগুলোকেই সইতে হচ্ছে।
মরুভূমিকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা আর জীববৈচিত্র্যের এই মহাবিপর্যয় কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট। শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ (GCF) কিংবা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে যে আমলাতান্ত্রিক ও political টালবাহানা করছে, তা মূলত মানবতার বিরুদ্ধে এক নীরব অপরাধের শামিল। ধনী দেশগুলো নিজেদের বিলাসী জীবনযাত্রা ও শিল্পায়নের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে, একে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতি এক ধরণের 'দাতব্য' বা অনুকম্পা হিসেবে দেখাতে চায়।
"আমাদের এই ক্ষমতার রাজনীতি, মুনাফাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন এবং উদাসীন মানসিকতা আগামী প্রজন্মের বুক থেকে বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি আর বাসযোগ্য মাটির অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।"
বিশ্ব আজ জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) থেকে বহু দূরে। আমরা যদি আজই আমাদের রাষ্ট্রনীতি, উন্নয়ন কাঠামো এবং জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন না আনি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখে আমরা স্রেফ একদল স্বার্থপর রাজনৈতিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হব।
তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের আহ্বান—আসুন, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে ফাঁকা রাজনৈতিক বুলি, করপোরেট গ্রিনওয়াশিং (পরিবেশবান্ধব সাজার ভণ্ডামি) এবং প্রচারণার বৃত্ত থেকে মুক্ত করি।
প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপ ফিরিয়ে দিতে বিশ্বব্যাপী ‘ইকোসাইড’ (Ecocide) বা প্রকৃতি ধ্বংসকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্রতিটি দেশে টেকসই উন্নয়ন ও বৃক্ষরোপণকে বাধ্যতামূলক নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কেবল একদিনের উদযাপনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নাগরিক ও রাষ্ট্রকে পরিবেশ সচেতন হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পরিবেশ বাঁচানো কোনো পরাশক্তির দয়া বা অনুদান নয়; এটি মানবজাতির টিকে থাকার একমাত্র উপায় এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব। ধরিত্রী রুগ্ন থাকলে সভ্যতা সুস্থ থাকতে পারে না—এই পরম সত্যটি যত দ্রুত আমরা বুঝব, ততই মঙ্গল।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ বিশ্ব পরিবেশ দিবস, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক দক্ষিণ, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, ইকোসাইড, পরিবেশ কূটনীতি, আসিফ মিজান, পরিবেশ কলাম, টেকসই উন্নয়ন World Environment Day, Climate Change, Eco-Politics, Global South, Green Climate Fund, Ecocide, Climate Justice, Asif Mizan, Environment Column, Sustainable Development

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
প্রতি বছর ৫ জুন যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ফিরে আসে, তখন সভ্যতার খতিয়ান মেলাতে গিয়ে এক গভীর আত্মগ্লানি ভর করে। ১৯৭৪ সাল থেকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর উদ্যোগে এই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—"প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য"।
কিন্তু এই জমকালো স্লোগান আর অমোঘ বাণীর সমান্তরালে আজ এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা। প্রকৃতি আজ আর স্রেফ কোনো জড় উপাদান নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। অথচ পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর রাজনীতির দাবার চালে এই জীবন্ত সত্তা আজ দিনে দিনে আরও রুগ্ন, আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্দরমহল এবং পরিবেশ সংকটের গভীরতা যখন মেলাই, তখন একটি চরম বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ধরিত্রী ধ্বংসের মহোৎসব চলছে অবলীলায়, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। এই আন্দোলনের অন্তরালে সুকৌশলে জড়িয়ে আছে ‘পরিবেশ রক্ষার কূটনীতি’ বা 'Eco-politics'।
বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলো (COP) আজ কার্যকর সমাধানের চেয়ে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চালবাজি, কার্বন-ট্রেডিংয়ের হিসাব-নিকাশ এবং বাণিজ্যিক দরকষাকষির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান ও বাস্তবতার নিরিখে পরিবেশ রক্ষার যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তা এই রাজনীতির চালে ও আমলাতান্ত্রিক জালে আটকা পড়ে দমবন্ধ হয়ে মরছে।
সোমালিয়ার শুষ্ক, রুক্ষ মাটি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দিকে তাকালে এই সংকটের নৈতিক স্খলনটি পরিষ্কার বোঝা যায়।
জলবায়ু বিজ্ঞানের ডেটা বলছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অবদান ১ শতাংশেরও কম।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও প্রধান নির্মম ধাক্কাটি এই দেশগুলোকেই সইতে হচ্ছে।
মরুভূমিকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা আর জীববৈচিত্র্যের এই মহাবিপর্যয় কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট। শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ (GCF) কিংবা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে যে আমলাতান্ত্রিক ও political টালবাহানা করছে, তা মূলত মানবতার বিরুদ্ধে এক নীরব অপরাধের শামিল। ধনী দেশগুলো নিজেদের বিলাসী জীবনযাত্রা ও শিল্পায়নের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে, একে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতি এক ধরণের 'দাতব্য' বা অনুকম্পা হিসেবে দেখাতে চায়।
"আমাদের এই ক্ষমতার রাজনীতি, মুনাফাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন এবং উদাসীন মানসিকতা আগামী প্রজন্মের বুক থেকে বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি আর বাসযোগ্য মাটির অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।"
বিশ্ব আজ জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) থেকে বহু দূরে। আমরা যদি আজই আমাদের রাষ্ট্রনীতি, উন্নয়ন কাঠামো এবং জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন না আনি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখে আমরা স্রেফ একদল স্বার্থপর রাজনৈতিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হব।
তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের আহ্বান—আসুন, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে ফাঁকা রাজনৈতিক বুলি, করপোরেট গ্রিনওয়াশিং (পরিবেশবান্ধব সাজার ভণ্ডামি) এবং প্রচারণার বৃত্ত থেকে মুক্ত করি।
প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপ ফিরিয়ে দিতে বিশ্বব্যাপী ‘ইকোসাইড’ (Ecocide) বা প্রকৃতি ধ্বংসকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্রতিটি দেশে টেকসই উন্নয়ন ও বৃক্ষরোপণকে বাধ্যতামূলক নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কেবল একদিনের উদযাপনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নাগরিক ও রাষ্ট্রকে পরিবেশ সচেতন হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পরিবেশ বাঁচানো কোনো পরাশক্তির দয়া বা অনুদান নয়; এটি মানবজাতির টিকে থাকার একমাত্র উপায় এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব। ধরিত্রী রুগ্ন থাকলে সভ্যতা সুস্থ থাকতে পারে না—এই পরম সত্যটি যত দ্রুত আমরা বুঝব, ততই মঙ্গল।

আপনার মতামত লিখুন