নজর বিডি

বানিয়াচংয়ে কৃষকের প্রণোদনা তালিকায় নজিরবিহীন অনিয়ম, তদন্তের দাবিতে আজ মানববন্ধন

বানিয়াচংয়ে কৃষকের প্রণোদনা তালিকায় নজিরবিহীন অনিয়ম, তদন্তের দাবিতে আজ মানববন্ধন

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ প্রভাবশালী নেতাদের নিকটাত্মীয়, ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং প্রবাসীদের নাম। 

এই ঘটনায় স্থানীয় প্রান্তিক চাষি ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইছে। অনিয়মের প্রতিবাদে ও পুনঃতদন্তের দাবিতে আজ ৭ জুন (রবিবার) সকালে বানিয়াচং বড়বাজার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বানিয়াচং উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের হাজার হাজার হেক্টর বৈশাখী বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়েন হাজারো প্রান্তিক চাষি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সরকারি নির্দেশনায় বানিয়াচং উপজেলা কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে ৮ হাজার ৭শত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে সরকারিভাবে সাড় ৪ হাজার কৃষকের নাম প্রণোদনার জন্য অনুমোদন পায়। সম্প্রতি উপজেলা কৃষি বিভাগ ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে এই তালিকাটি প্রেরণের পর পরই পুরো উপজেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তালিকায় অ-কৃষক, নারী-পুরুষ ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তালিকায় দেখা যায়, বানিয়াচং উপজেলা সদরের ১নং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত সাদিক মিয়ার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদেরই ৯টি নাম রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেশ-বিদেশ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

সমালোচনার মুখে পড়ে সাদিক মিয়া তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে তালিকার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, "এখানে শুধু আমার পিতা ও ভাইয়ের নামটি ফটোকার্ড করে প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় থাকা বাকিরা আমার আত্মীয় হলেও তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং এই প্রণোদনার হকদার।" তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের এক কানি (৩০ শতক) জমিও নেই। সাদিক মিয়া নিজে হাওরের একটি অংশে প্রজেক্ট আকারে পানি দেওয়ার ব্যবসা করেন, যা কৃষি কাজের মধ্যে পড়ে না।

অনুরূপভাবে, ৩নং দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক মো. ছামির মিয়ার পরিবারের আপন ছোট ভাই, ভাতিজা, বোন, ভগ্নিপতি ও শ্যালিকাসহ বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম তালিকায় এসেছে। চূড়ান্ত তালিকার ১১৪ নং ক্রমিকে ছামির মিয়ার আপন ছোট ভাই সিরফল মিয়া, ৫৯ নং ক্রমিকে বোন আয়মনা বিবি, ৭৫নং ক্রমিকে ভগ্নিপতি শরীফ উল্লা, ৫৫ নং ক্রমিকে ভাতিজা সিজিল এবং ৮০ নং ক্রমিকে শ্যালিকা হোসনা বেগমের নাম রয়েছে। প্রতিবেশীদের দাবি, তারা সবাই এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং কখনোই কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এছাড়া ২নং উত্তর-পশ্চিম ইউনিয়নের ১০০ ও ১৪৭ নং ক্রমিকে দুই বছর ধরে প্রবাসে থাকা ব্যক্তির নামও তালিকায় পাওয়া গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করেছেন এবং ধনাঢ্য ও অ-কৃষকদের তালিকায় ঢুকিয়ে কৃষকদের সাথে প্রতারণা করেছেন।" তারা এই ভুয়া তালিকা বাতিল করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে তাঁর সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠানো হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, প্রণোদনা তালিকায় এই নজিরবিহীন জালিয়াতির প্রতিবাদে আজ ৭ জুন (রবিবার) সকালে বানিয়াচং উপজেলা সদরের বড়বাজার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ হবিগঞ্জ, বানিয়াচং, কৃষক প্রণোদনা তালিকা, কৃষি অফিস, দুর্নীতি, অনিয়ম, মানববন্ধন, বানিয়াচং নিউজ, হবিগঞ্জ নিউজ, বোরো চাষি, ত্রাণ কেলেঙ্কারি Habiganj, Baniyachong, Farmers Incentives, Agricultural Corruption, Incentive List Scandal, Baniyachong News, Habiganj News, Farmers Protest, Human Chain

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


বানিয়াচংয়ে কৃষকের প্রণোদনা তালিকায় নজিরবিহীন অনিয়ম, তদন্তের দাবিতে আজ মানববন্ধন

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ প্রভাবশালী নেতাদের নিকটাত্মীয়, ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং প্রবাসীদের নাম। 

এই ঘটনায় স্থানীয় প্রান্তিক চাষি ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইছে। অনিয়মের প্রতিবাদে ও পুনঃতদন্তের দাবিতে আজ ৭ জুন (রবিবার) সকালে বানিয়াচং বড়বাজার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বানিয়াচং উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের হাজার হাজার হেক্টর বৈশাখী বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়েন হাজারো প্রান্তিক চাষি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সরকারি নির্দেশনায় বানিয়াচং উপজেলা কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে ৮ হাজার ৭শত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে সরকারিভাবে সাড় ৪ হাজার কৃষকের নাম প্রণোদনার জন্য অনুমোদন পায়। সম্প্রতি উপজেলা কৃষি বিভাগ ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে এই তালিকাটি প্রেরণের পর পরই পুরো উপজেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তালিকায় অ-কৃষক, নারী-পুরুষ ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তালিকায় দেখা যায়, বানিয়াচং উপজেলা সদরের ১নং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত সাদিক মিয়ার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদেরই ৯টি নাম রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেশ-বিদেশ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

সমালোচনার মুখে পড়ে সাদিক মিয়া তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে তালিকার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, "এখানে শুধু আমার পিতা ও ভাইয়ের নামটি ফটোকার্ড করে প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় থাকা বাকিরা আমার আত্মীয় হলেও তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং এই প্রণোদনার হকদার।" তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের এক কানি (৩০ শতক) জমিও নেই। সাদিক মিয়া নিজে হাওরের একটি অংশে প্রজেক্ট আকারে পানি দেওয়ার ব্যবসা করেন, যা কৃষি কাজের মধ্যে পড়ে না।

অনুরূপভাবে, ৩নং দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক মো. ছামির মিয়ার পরিবারের আপন ছোট ভাই, ভাতিজা, বোন, ভগ্নিপতি ও শ্যালিকাসহ বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম তালিকায় এসেছে। চূড়ান্ত তালিকার ১১৪ নং ক্রমিকে ছামির মিয়ার আপন ছোট ভাই সিরফল মিয়া, ৫৯ নং ক্রমিকে বোন আয়মনা বিবি, ৭৫নং ক্রমিকে ভগ্নিপতি শরীফ উল্লা, ৫৫ নং ক্রমিকে ভাতিজা সিজিল এবং ৮০ নং ক্রমিকে শ্যালিকা হোসনা বেগমের নাম রয়েছে। প্রতিবেশীদের দাবি, তারা সবাই এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং কখনোই কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এছাড়া ২নং উত্তর-পশ্চিম ইউনিয়নের ১০০ ও ১৪৭ নং ক্রমিকে দুই বছর ধরে প্রবাসে থাকা ব্যক্তির নামও তালিকায় পাওয়া গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করেছেন এবং ধনাঢ্য ও অ-কৃষকদের তালিকায় ঢুকিয়ে কৃষকদের সাথে প্রতারণা করেছেন।" তারা এই ভুয়া তালিকা বাতিল করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে তাঁর সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠানো হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, প্রণোদনা তালিকায় এই নজিরবিহীন জালিয়াতির প্রতিবাদে আজ ৭ জুন (রবিবার) সকালে বানিয়াচং উপজেলা সদরের বড়বাজার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত