একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব কিংবা শুষ্ক সংখ্যার মারপ্যাঁচ নয়; এটি মূলত সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের এক অনন্য সামাজিক- দলিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে পেশকৃত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটটি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের অভ্যন্তর ও বৈশ্বিক অর্থনীতি এক জটিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের (Macroeconomic Transition) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
স্বভাবসুলভভাবেই এই বাজেটকে ঘিরে সরকারি দলের আত্মতুষ্টি এবং বিরোধী দলের তাৎক্ষণিক রাজপথের প্রথাবদ্ধ প্রতিবাদ—উভয়ই দৃশ্যমান। তবে জনতুষ্টির এই চিরাচরিত সমীকরণে খাতওয়ারী যুক্তিসংগত সমালোচনা ও ডেটা-ভিত্তিক পরামর্শের মাধ্যমে বাজেটকে আরও বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব করার যে গণতান্ত্রিক সুযোগ থাকে, তা বরাবরের মতোই উপেক্ষিত। বিরোধী দলগুলোর এই সনাতনী আচরণ এবং অন্ধ বিরোধিতার ঐতিহ্য জনমনে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (যা প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি ওঠানামা করছে) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপের প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট প্রস্তুত করা সরকারের জন্য ছিল এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা।
সরকার বরাবরের মতোই কিছু জনতুষ্টিমূলক (Populist) পদক্ষেপ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর (Social Safety Net) আওতা বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছে।
তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কঠোর বাস্তবতায় এই বাজেট বাস্তবায়ন কতটা করদাতাবান্ধব থাকবে—তা নিয়ে সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে।
অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সংকোচন এবং রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জটি পুরোপুরি সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত যেখানে দীর্ঘকাল ধরে একক অঙ্কের (Single Digit) ঘরে আটকে আছে, সেখানে অতিরিক্ত করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর না চাপিয়ে কীভাবে করের আওতা বাড়ানো যায়, সেটাই ছিল প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যুব কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক ও সামাজিক খাতগুলোতে বড় বরাদ্দ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল যেখানে পুরো বাজেটকে ঢালাওভাবে 'গণবিরোধী' বলে প্রত্যাখ্যান করছে, সেখানে এই সুনির্দিষ্ট ডেটা ও নীতিগুলো গভীর একাডেমিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
নতুন অর্থবছরে শিক্ষা খাতে রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী জিডিপির ৬%) এটি এখনও কম হলেও, দীর্ঘ স্থবিরতার পর শিক্ষার বরাদ্দকে জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা মেধাভিত্তিক জাতি গঠনে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এর সাথে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত 'স্টুডেন্ট লোন' এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এআই-নির্ভর (AI-driven) শিক্ষা ব্যবস্থার মতো আধুনিক রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্বাস্থ্যের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ করে ৩৫,৫৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Universal Health Coverage) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। এছাড়া ৫,০০০ নতুন চিকিৎসক ও ১,০০,০০০ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রান্তিক নাগরিকদের জন্য আধুনিক 'হেলথ কার্ড' চালুর মতো মেগা-প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে যুব ও কর্মসংস্থান খাতের মাধ্যমে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশীল দেশীয় শিল্পে কর ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন ক্ষেত্র তৈরির ঘোষণা রয়েছে, যা দেশের 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা জনমিতিক লভ্যাংশকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের প্রধান আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব হলো সরকারের নীতি ও বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তার বিকল্প জনবান্ধব প্রস্তাবনা হাজির করা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক ঐতিহ্য স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক জায়গায় এত বড় বরাদ্দ বৃদ্ধি বা ইতিবাচক সংস্কারের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও, বিরোধী দল কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক পর্যালোচনা ছাড়াই একে 'লুটেরা বাজেট' বা 'ঋণনির্ভর বাজেট' আখ্যা দিয়ে রাজপথে সনাতনী মিছিল-মিটিং শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলো বা থিংক-ট্যাংকগুলো একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প 'ছায়া বাজেট' (Shadow Budget) পেশ করে তাদের অর্থনৈতিক যোগ্যতা প্রমাণ করে। অথচ আমাদের দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে খাতওয়ারী যুক্তিসংগত বিকল্প রূপরেখা দেওয়ার সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত।
এই ধরনের অন্ধ বিরোধিতার ফলে সাধারণ মানুষের মনে যৌক্তিক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে যে—বিরোধী দল আসলেই জনগণের কল্যাণ চায়, নাকি কেবলই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে রাজপথ গরম করার নীতি বেছে নিয়েছে।
উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রে টেকসই অর্থনীতি ও মানবসম্পদ গড়তে হলে বাজেটকে সস্তা রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে একটি 'জাতীয় অর্থনৈতিক চুক্তি' (National Economic Pact) হিসেবে দেখা উচিত। বিরোধী দলের আন্দোলন রাজপথে ব্যানার-ফেস্টুনে না হয়ে তথ্যের টেবিলে হওয়া উচিত ছিল। যেমন এই খাতগুলোর ক্ষেত্রে তাদের গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারত নিম্নরূপ:
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও আমাদের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর তা সঠিকভাবে এবং দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে ব্যয় করার সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি করা।
নতুন ভবন নির্মাণ বা হার্ডওয়্যার ক্রয়ের চেয়ে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকদের গ্রামীণ অঞ্চলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হলো, সেই 'শুভঙ্করের ফাঁকি'গুলো সুনির্দিষ্ট ডেতাসহ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা।
মধ্যম ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর পরোক্ষ করের (VAT) বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচার রোধ এবং ধনীদের ওপর প্রগতিশীল কর (Progressive Taxation) আরোপ করে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা যায়—তার একটি বিকল্প গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি মনে করি, জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়নামা নয়, এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের মেধা, জ্ঞান এবং স্বাস্থ্যের বুনিয়াদ গড়ার সামষ্টিক পথনকশা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে এর প্রকৃত সুফল তখনই milbe যখন আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ বা 'অ্যাকাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন' (Academia-Industry Collaboration) তৈরি করতে পারব। আমাদের তরুণদের শুধু সনাতনী ডিগ্রিধারী বেকার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনমানুষের আজ অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা—তারা যেন চর্বিতচর্বণ স্লোগান ও অন্ধ বৈরিতার সংস্কৃতি পরিহার করে তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। রাজনীতির জয়-পরাজয়ের চেয়ে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, মেধার বিকাশ ও অর্থনৈতিক মুক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজপথের উত্তাপের চেয়ে সংসদের বিতর্কের টেবিলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক অংশীদারিত্বের চর্চা শুরু করা আজ সময়ের দাবি; তবেই আমরা একটি সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব ও বাস্তবমুখী রাষ্ট্র কাঠামো উপহার দিতে পারব।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব কিংবা শুষ্ক সংখ্যার মারপ্যাঁচ নয়; এটি মূলত সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের এক অনন্য সামাজিক- দলিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে পেশকৃত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটটি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের অভ্যন্তর ও বৈশ্বিক অর্থনীতি এক জটিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের (Macroeconomic Transition) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
স্বভাবসুলভভাবেই এই বাজেটকে ঘিরে সরকারি দলের আত্মতুষ্টি এবং বিরোধী দলের তাৎক্ষণিক রাজপথের প্রথাবদ্ধ প্রতিবাদ—উভয়ই দৃশ্যমান। তবে জনতুষ্টির এই চিরাচরিত সমীকরণে খাতওয়ারী যুক্তিসংগত সমালোচনা ও ডেটা-ভিত্তিক পরামর্শের মাধ্যমে বাজেটকে আরও বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব করার যে গণতান্ত্রিক সুযোগ থাকে, তা বরাবরের মতোই উপেক্ষিত। বিরোধী দলগুলোর এই সনাতনী আচরণ এবং অন্ধ বিরোধিতার ঐতিহ্য জনমনে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (যা প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি ওঠানামা করছে) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপের প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট প্রস্তুত করা সরকারের জন্য ছিল এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা।
সরকার বরাবরের মতোই কিছু জনতুষ্টিমূলক (Populist) পদক্ষেপ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর (Social Safety Net) আওতা বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছে।
তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কঠোর বাস্তবতায় এই বাজেট বাস্তবায়ন কতটা করদাতাবান্ধব থাকবে—তা নিয়ে সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে।
অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সংকোচন এবং রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জটি পুরোপুরি সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত যেখানে দীর্ঘকাল ধরে একক অঙ্কের (Single Digit) ঘরে আটকে আছে, সেখানে অতিরিক্ত করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর না চাপিয়ে কীভাবে করের আওতা বাড়ানো যায়, সেটাই ছিল প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যুব কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক ও সামাজিক খাতগুলোতে বড় বরাদ্দ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল যেখানে পুরো বাজেটকে ঢালাওভাবে 'গণবিরোধী' বলে প্রত্যাখ্যান করছে, সেখানে এই সুনির্দিষ্ট ডেটা ও নীতিগুলো গভীর একাডেমিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
নতুন অর্থবছরে শিক্ষা খাতে রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী জিডিপির ৬%) এটি এখনও কম হলেও, দীর্ঘ স্থবিরতার পর শিক্ষার বরাদ্দকে জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা মেধাভিত্তিক জাতি গঠনে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এর সাথে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত 'স্টুডেন্ট লোন' এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এআই-নির্ভর (AI-driven) শিক্ষা ব্যবস্থার মতো আধুনিক রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্বাস্থ্যের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ করে ৩৫,৫৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Universal Health Coverage) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। এছাড়া ৫,০০০ নতুন চিকিৎসক ও ১,০০,০০০ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রান্তিক নাগরিকদের জন্য আধুনিক 'হেলথ কার্ড' চালুর মতো মেগা-প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে যুব ও কর্মসংস্থান খাতের মাধ্যমে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশীল দেশীয় শিল্পে কর ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন ক্ষেত্র তৈরির ঘোষণা রয়েছে, যা দেশের 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা জনমিতিক লভ্যাংশকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের প্রধান আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব হলো সরকারের নীতি ও বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তার বিকল্প জনবান্ধব প্রস্তাবনা হাজির করা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক ঐতিহ্য স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক জায়গায় এত বড় বরাদ্দ বৃদ্ধি বা ইতিবাচক সংস্কারের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও, বিরোধী দল কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক পর্যালোচনা ছাড়াই একে 'লুটেরা বাজেট' বা 'ঋণনির্ভর বাজেট' আখ্যা দিয়ে রাজপথে সনাতনী মিছিল-মিটিং শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলো বা থিংক-ট্যাংকগুলো একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প 'ছায়া বাজেট' (Shadow Budget) পেশ করে তাদের অর্থনৈতিক যোগ্যতা প্রমাণ করে। অথচ আমাদের দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে খাতওয়ারী যুক্তিসংগত বিকল্প রূপরেখা দেওয়ার সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত।
এই ধরনের অন্ধ বিরোধিতার ফলে সাধারণ মানুষের মনে যৌক্তিক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে যে—বিরোধী দল আসলেই জনগণের কল্যাণ চায়, নাকি কেবলই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে রাজপথ গরম করার নীতি বেছে নিয়েছে।
উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রে টেকসই অর্থনীতি ও মানবসম্পদ গড়তে হলে বাজেটকে সস্তা রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে একটি 'জাতীয় অর্থনৈতিক চুক্তি' (National Economic Pact) হিসেবে দেখা উচিত। বিরোধী দলের আন্দোলন রাজপথে ব্যানার-ফেস্টুনে না হয়ে তথ্যের টেবিলে হওয়া উচিত ছিল। যেমন এই খাতগুলোর ক্ষেত্রে তাদের গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারত নিম্নরূপ:
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও আমাদের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর তা সঠিকভাবে এবং দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে ব্যয় করার সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি করা।
নতুন ভবন নির্মাণ বা হার্ডওয়্যার ক্রয়ের চেয়ে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকদের গ্রামীণ অঞ্চলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হলো, সেই 'শুভঙ্করের ফাঁকি'গুলো সুনির্দিষ্ট ডেতাসহ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা।
মধ্যম ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর পরোক্ষ করের (VAT) বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচার রোধ এবং ধনীদের ওপর প্রগতিশীল কর (Progressive Taxation) আরোপ করে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা যায়—তার একটি বিকল্প গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি মনে করি, জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়নামা নয়, এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের মেধা, জ্ঞান এবং স্বাস্থ্যের বুনিয়াদ গড়ার সামষ্টিক পথনকশা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে এর প্রকৃত সুফল তখনই milbe যখন আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ বা 'অ্যাকাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন' (Academia-Industry Collaboration) তৈরি করতে পারব। আমাদের তরুণদের শুধু সনাতনী ডিগ্রিধারী বেকার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনমানুষের আজ অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা—তারা যেন চর্বিতচর্বণ স্লোগান ও অন্ধ বৈরিতার সংস্কৃতি পরিহার করে তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। রাজনীতির জয়-পরাজয়ের চেয়ে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, মেধার বিকাশ ও অর্থনৈতিক মুক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজপথের উত্তাপের চেয়ে সংসদের বিতর্কের টেবিলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক অংশীদারিত্বের চর্চা শুরু করা আজ সময়ের দাবি; তবেই আমরা একটি সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব ও বাস্তবমুখী রাষ্ট্র কাঠামো উপহার দিতে পারব।

আপনার মতামত লিখুন